মোহন মিন্টু :
ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকেই মূলত অনলাইন গণমাধ্যম বলা হয়। যে কারণে ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতাই অনলাইন সাংবাদিকতা। আর এই তথ্য-প্রযুক্তি-ই আধুনিক সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক যাপিত জীবন। দীর্ঘদিনের চলমান অভ্যাসের সাথে বদলে যাচ্ছে চিন্তা, রুচিও। জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সংবাদপত্র বা সাংবাদিকতার সনাতনী ধারাও। ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে আগামী দিনের সাংবাদিকতা।
খবর জানতে এখন আর কাগুজে সংবাদপত্রের জন্য অপেক্ষা করে না মানুষ। দ্রুত খবর জানতে আশ্রয় নেয় ইন্টারনেটের। বাংলাদেশেও প্রায় সব শীর্ষ সংবাদপত্র এখন প্রিন্ট কপির পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। প্রিন্ট মিডিয়া ছেড়ে অনলাইন মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে পাঠক। বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে অনলাইন পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থাগুলো।
সংবাদপত্রের ইতিহাস খ্রিস্ট জন্মেরও আগের। অর্থাৎ প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো। ১৪০০ সালে ছাপার মেশিন আবিষ্কারের আগেও হাতে লেখা সংবাদপত্রের অস্তিত্ব ছিল। তবে ১৬৬৪ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয় পৃথিবীর সর্বপ্রম সত্যিকারের আধুনিক সংবাদপত্র ‘লন্ডন গ্যাজেট’। ১৭৮০ সালে প্রকাশিত ‘ক্যালকাটা গ্যাজেট’ বা ‘হিকিস বেঙ্গল গ্যাজেট’ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষের হাতে আসে ‘সংবাদপত্র’ নামক ধনী মানুষদের এই বিলাস সামগ্রীটি। ১৮ শতাব্দীতে বড় বড় ছাপার যন্ত্র উদ্ভাবন, টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার, সংবাদপত্রে প্রথমবারের মতো ছবি বা ফটোগ্রাফ ব্যবহারের সুযোগ সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তাকে আকাশচুম্বী করে তোলে। যে কারণে ১৮৯০ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন এজ অব প্রিন্ট মিডিয়া’।
তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার দিক দিয়ে দেশের অনলাইন নিউজপোর্টাল গুলো নতুন মাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের আওতায় গ্রামের সাধারণ মানুষেগুলোও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যসেবা পাচ্ছে। আমাদের দেশের সংবাদপত্র যেখানে এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুুল ব্যাপার, সেখানে মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার ব্যাবহার করে দেশ-বিদেশের খবরগুলো অনলাইন নিউজ পোটাল গুলোর মাধ্যমে জানা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সংবাদপত্রের গুরুত্ব খানিকটা হলেও ভাটা পড়তে শুরু করেছে। মানুষের হাতে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ায় সময়ের প্রয়োজনেই মানুষ অনলাইন পত্রিকার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।
ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদ বা অন্যান্য তথ্য দেখার জন্য যেখানে আলাদাভাবে সময় বের করে টেলিভিশনের সামনে বসতে হয়, সেখানে ইচ্ছে করলেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারাবিশ্বের তথ্য মুহূর্তেই জানা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহারে অনলাইন গণমাধ্যম বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পকে দিতে পারে এক নতুন মাত্রা।
২০১১ সালের আগস্টে একটি মার্কিন ওয়েব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে একশ কোটিরও বেশি ওয়েবসাইট রয়েছে। যার ১০ ভাগেরও বেশি ওয়েবসাইট সংবাদসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ প্রায় সাতশ কোটি মানুষের এ পৃথিবীতে প্রতি সাতজনের জন্য একটি ওয়েবসাইট এবং প্রতি ৭০ জনের জন্য একটি অনলাইন পত্রিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী অনলাইন সংবাদপত্রের এই জয়জয়কার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে মিডিয়া সম্রাট রুপার্ট মার্ডক বলেন, ‘ইন্টারনেট পাঠকদের অনেক বেশি ক্ষমতা দিয়েছে।’ হাফিংটন পোস্টের সম্পাদক আ্যারিয়ানা হাফিংটনের মতে, ‘এটি সংবাদপত্রের জন্য দুঃসময় হলেও সংবাদ ক্রেতাদের জন্য সুসময়।’
১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম বিবিসি ভিডিওটেক্সট নামে একটি ইন্টার-অ্যাকটিভ মিডিয়া চালুর চেষ্টা করে। ওই সালেই নিউইয়র্ক টাইমস একটি অনলাইন তথ্যভান্ডার তৈরি করে। ১৯৭৪ সালে ‘নিউজ রিপোর্ট’ নামে সর্বপ্রম অনলাইন সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যেটি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনস (University of Illinois)-G PLATO system (Programmed Logic for Automated Teaching Operations) ব্যবহার করে ব্রুস প্যারেলো চালু করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু সংবাদপত্র মুদ্রিত সংখ্যার পাশাপাশি অনলাইন সংস্করণ চালু করে। যার মধ্যে ১৯৯১ সালে চালু হওয়া দ্য উইকেন্ড সিটি প্রেস রিভিউ পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে। তবে সত্যিকারের অনলাইন সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় সাউথপোর্ট রিপোর্টার নামে ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে।
বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদ সংস্থার যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে শুধু ইংরেজি ভার্সনে সংবাদ প্রকাশ ও সরবরাহ শুরু করে দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ২৪.কম। যার স্বপ্নদ্রষ্টা, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক আলমগীর হোসেন। তার হাত ধরেই সূচিত হয় এ দেশীয় সাংবাদিকতায় এক নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটি নতুন যুগে প্রবেশ করে। বিশ্বব্যাপী স্বকীয়তা নিয়ে উপস্থাপিত হয় বাংলাদেশ। যে কারণে আলমগীর হোসেনকেই বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার জনক।
তবে এরও বছর পাঁচেক আগে সহস্রাব্দের প্রারম্ভে দেশের প্রধান দুটি সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলো তাদের প্রিন্টভার্সন অনলাইনে প্রকাশ শুরু করে। সে অর্থে ইন্টারনেটে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি ঘটে সহস্রাব্দের আগেই। সেভাবেই শুরু বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার যাত্রা।
আর জনসাংবাদিকতা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করে এবং তা একটা সমাধানের দিকনির্দেশনা দেবে। জনসাংবাদিকতা মূলত জনসাধারণের ইস্যুগুলোকে সমাধানের ইঙ্গিত দেয়। জনসাংবাদিকতা তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে ক্ষমতায়ন করার প্রক্রিয়া। পরিবর্তনের সাথে অভিযোজিত হতে গেলে নতুন জ্ঞান, দক্ষতা এবং সক্ষমতার প্রয়োজন। এই ধারার সাংবাদিকতা জনমানুষের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা এবং স্বপ্নের সঞ্চারণ ঘটিয়ে নতুন সময়ের জন্য সক্ষম করে তোলে। যা কিছু প্রান্তিক তার সব ফেলনা নয়। জনমানুষের জ্ঞান, স্মৃতি, দর্শন, দক্ষতা, সম্প্রীতি, আধ্যাত্মিকতা, সঙ্গীত, শিল্প, আচার, পার্বণ সবই মূল্যবান সামাজিক উপাদান। এগুলোর সাথে নতুন সময়ের জ্ঞান সক্ষমতার সম্মেলন ঘটানোই জনসাংবাদিকতার আরাধ্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশির দশকের মাঝামাঝি একদল সাংবাদিকের সংবাদ-চর্চায় প্রচলিত ধারার সাংবাদিকতার অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। তাদের সেই বৈপ্লবিক চেষ্টার মধ্যেই নিহিত ছিল জনসাংবাদিকতার দর্শন। বাংলাদেশে এ ধারার সাংবাদিকতার বিকাশ সম্পর্কে বলা যায়, এখনো এর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়নি। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে এদেশে উৎস, স্থান, ঘটনা, সংবাদ-কাঠামো ইত্যাদির পক্ষপাতিত্ব রয়েছে । অথচ এদেশের অধিকাংশ মানুষ প্রান্তিক। উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে যখন প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা যাবে। আর এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। জনসম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উঠলে জনসাংবাদিকতার বিষয়টি সামনে চলে আসে অনিবার্যভাবে। যদিও জনসম্পৃক্ত বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু দৈনিক পত্র-পত্রিকা বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মূলত কখনও উন্নয়নমূলক বা কোনো ব্যক্তির সাফল্যের বিষয় উঠে আসে।
অবশ্য পত্রিকাগুলো কখনো কখনো পক্ষপাতমুক্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। তবে এখনো প্রতিবেদনগুলো তৈরি হয় প্রচলিত কাঠামো অনুসরণ করে। এখনো বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ-প্রতিবেদন তৈরি করা হয় কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। যার আদল অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ। কোনো ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পূর্বে বা যে সমস্যাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি সংগঠিত হলো; জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে কীভাবে ঘটনাটির সমাধান করা যায় সংবাদপত্রে এ বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না।
গ্রামপ্রধান এদেশের একেক অঞ্চলে রয়েছে একেক সমস্যা। আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত ও উন্নয়ন এসব সমস্যা সমাধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অথচ আমাদের দেশের সাংবাদিকতায় প্রান্তিক বিষয়ে প্রতিবেদন করার প্রবণতা কম। প্রান্তবর্তী মানুষদের সমস্যায় তাদের নিয়োজিত করে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় সে বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।
শুরু থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় পত্রিকাগুলোর চরিত্র হচ্ছে ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোয় মফস্বল এবং গ্রামের সংবাদ ছাপানো। আর প্রায়ই পত্রিকাগুলো এর জন্য অর্ধেক বা তার কম পৃষ্ঠা বরাদ্দ রাখে। কখনো কখনো মফস্বল সংবাদ যে অর্ধেক পৃষ্ঠাকে ছাড়িয়ে যায় তা মূলত সেই সময়ে বা সেই দিনের বিজ্ঞাপনের অপ্রতুলতার কারণে। খেলাধুলা, বিনোদন প্রভৃতির মতো কম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের জন্য পত্রিকাগুলো প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠাগুলো ব্যবহার করে। এসব পৃষ্ঠাকে রঙিন করে ছাপা হয়। অথচ মফস্বল সংবাদ ছাপা হয় সাদাকালো পৃষ্ঠায়। বেশির ভাগ সংবাদপত্রে মফস্বলের পাতা শুধুমাত্র তখনই রঙিন হয় যখন ওই পাতায় কোনো রঙিন বিজ্ঞাপন থাকে। এর ব্যতিক্রম নেই বললেই চলে। মফস্বলের খবরকে রঙিন করা বা সামনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠায় ছাপানোকে পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকরা এখনো অপচয়ই ভাবেন।
লক্ষ্য যেকোনো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত ও সর্বতোভাবে সফল করার জন্য দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সংবাদ তথা তথ্যের সমবন্টন প্রয়োজন। শহর, মফস্বল, গ্রাম নির্বিশেষে সকল অঞ্চলের মানুষদেরকে যেমন সমানভাবে সংবাদ জানানো জরুরি তেমনি তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদের উপস্থাপনও হওয়া উচিত সাম্যনীতির ভিত্তিতে। সংবাদপত্রকে সমাজের সদস্যদের মতবিনিময় ও অভিন্ন সংকটের বিষয়গুলো আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজের সব অংশের সমান উন্নয়নের জন্য নগর ও মফস্বল বা গ্রামের সংবাদ আরোহন ও উপস্থাপন প্রক্রিয়াকে করতে হবে বৈষম্যহীন।
সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজির প্রভাবে সংবাদ মাধ্যম যে চরিত্রের অধিকারী হয়েছে তাতে সাংবাদিকতার উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বিজ্ঞাপন ও প্রকাশক-সম্পাদকদের পুঁজিবাদী চিন্তা-পদ্ধতি। অন্য আরো পুঁজিবাদী দেশের মতো বাংলাদেশের সংবাদপত্রও জনসাংবাদিকতাকে উপেক্ষা করে কর্পোরেট সাংবাদিকতার দিকে ধাবমান । কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় পত্রিকাগুলো কর্পোরেট সংবাদের প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগী হয়ে উঠছে। কর্পোরেট কোম্পানির আনুকূল্যের প্রত্যাশায় জনমানুষের খবরকে পাশ কাটিয়ে পত্রিকাগুলো পুঁজিসংশ্লিষ্ট খবরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ফলে জনসাংবাদিকতার প্রসার-প্রক্রিয়া হয়ে পড়ছে স্থবির। বিজ্ঞাপন সর্বস্বতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার, মানহীন রিপোর্টিং, পুঁজিমুখীনতা, জনস্বার্থ বিমুখতা, বক্তব্যের প্রাধান্য এসবই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচলিত সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের গতিচিত্র। এই গতিচিত্রে জনসাংবাদিকতার উপস্থিতি ও ধারা অনুল্লেখ্য ও ক্ষীণ। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কর্মকান্ড গুলোর এরকম বাস্তবতায় জনসাংবাদিকতা চর্চার বিষয়টি খুবই জরুরি। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের অবস্থাও কার্যকর হয় যদি সে সমাজের সকল শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ বাস করে গ্রামে। ফলে উন্নয়নের প্রশ্নে গ্রামের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। আর এই লক্ষে কাজ করছে অনলাইন সংবাদপত্র।
প্রায় সবশ্রেণীর সব পত্রিকাই শহুরে শ্রেণীর ফ্যাশন, খাবার, বিনোদন, খেলাধূলা, প্রভৃতির জন্য আলাদা করে বিশেষ ফিচার ও প্রতিবেদন প্রভৃতি ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে। ক্ষুদ্র শহুরে শ্রেণীর তুলনায় বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্টীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যর্থতাকে পত্রিকাগুলো কমই গুরুত্ব দেয়। প্রান্তিক মানুষদের যে কয়েকটি হাতেগোনা সংবাদ পত্রিকায় স্থান পায় তার মধ্যে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, নির্যাতন প্রভৃতির মতো দুর্ঘটনার আধিক্য সর্বদাই লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক সময়েও এই চিত্রের তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। গ্রামের মানুষদের আরো অনেক সমস্যাই থেকে যায় অন্তরালে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা যেমন আছে সাফল্যও আছে তেমন। গ্রামের সাফল্যের সংবাদ হবার হার সমস্যার সংবাদ হবার হারের তুলনায় আরো নাজুক। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন সাংবাদিকতার ধারণার প্রসার ঘটায় কিছু জাতীয় দৈনিক প্রান্তজনদের সাফল্যকে তুলে ধরছে। এতে এক ধরনের আশার আলো দেখা গেলেও এখনও সন্তোষ প্রকাশ করার কিছু নেই। এক ধরনের প্রতিযোগিতা আর কৌশলের কারণেই মূলত কয়েকটি পত্রিকা গ্রামের মানুষের সাফল্যকে প্রচার করছে।
পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার আর শেষ পৃষ্ঠায় নগরকেন্দ্রীক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি সংবাদ যে ট্রিটমেন্ট পায় গ্রামকেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সে ট্রিটমেন্ট পায় না। খুব কম সময়ই গ্রাম সম্পর্কিত খবরকে শীর্ষ সংবাদ করা হয়। পত্রিকার সবচে গুরুত্বপুর্ণ এই পৃষ্ঠা দুটোর সিংহভাগ সংবাদ নগরকেন্দ্রিক। নগর সংবাদের আকার, আয়তন, ধরন এবং প্রকাশের স্থানের সাথে গ্রাম সংবাদের আকার, আয়তন, ধরন এবং প্রকাশের স্থানের পার্থক্য সুবিশাল। বাংলাদেশের সব চরিত্রের পত্রিকাতেই নগর সংবাদ ও গ্রাম সংবাদ দৃষ্টকটু রকমের ভারসাম্যহীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জনসাংবাদিকতার প্রতি পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকের অনীহা লক্ষণীয়। তাদের আগ্রহ বরং বিজ্ঞাপনের দিকেই বেশি। সব পত্রিকাই বিজ্ঞাপনের জন্য মুখিয়ে থাকে। এখন সাংবাদিকতার নতুন হুমকি বিজ্ঞাপন। শুধু জনসাংবাদিকতাই নয় বিজ্ঞাপনের আগ্রাসনে সকল ধরনের সংবাদের অস্তিত্বই হয়ে পড়ছে সংকটগ্রস্থ। তবে আগ্রাসী বিজ্ঞাপনের প্রথম খড়গটি পড়ে গ্রাম সংবাদের ওপর। সুশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনীতি, দুর্নীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সন্ত্রাস প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলোর সাথে গণমাধ্যম ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। বলা যায় গণমাধ্যম এগুলো চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে গণমাধ্যমের কাঠামো, প্রযুক্তি এবং দায়বদ্ধতার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। অথচ গণমাধ্যমের বর্তমান বাস্তবতা এই যুক্তির সাথে মেলে না বললেই চলে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মিডিয়ার কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যেখানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই। এবং এসব গণমাধ্যমগুলোর মালিক পুঁজিপতি কর্পোরেশনগুলো। আর তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। যার ফলে তাদের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে সুযোগটাই বড় হয়ে ওঠে। আবার গণমাধ্যমগুলোকে মুনাফার জন্য বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করতে হয়।
তাছাড়া গণমাধ্যমের অধিকাংশ ভোক্তা শহরের ধনিক শ্রেণী। ফলে বিজ্ঞাপনের শর্তপূরণ করতে গণমাধ্যমগুলো শহরের ধনিক শ্রেণীর কর্মকান্ডকে বেশি প্রাধান্য দেয় কারণ, জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য ভোক্তাদের খবরগুলো বেশি করে দিতে হয়। ফলে গ্রামের খবরগুলো হয়ে পড়ে উপেক্ষিত।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কর্মকান্ডগুলোর এরকম বাস্তবতায় গ্রামীণ সাংবাদিকতা চর্চার বিষয়টি খুবই জরুরি। জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোতে গ্রাম সম্পর্কিত যে তথ্য থাকে সেগুলো গ্রামীণ জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তথ্যে গ্রামীণ জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হলে ‘লেভেল অব চয়েস’ এবং ‘লেভেল অব দি ব্যাক’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ গ্রামের জনগণকে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, আইন-শৃঙ্খলা, রাজনীতি, মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় তথ্য যোগানোর মাধ্যম হিসেবে গ্রামীণ সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এমতাবস্থায় গ্রামীণ সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনগণের তথ্য-চাহিদা অনেকখানি পূরণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় সংবাদদাতারা জনগণের চাহিদার সাথে মিল রেখে বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোতে গতানুগতিক কাঠামোগুলোতে পরিবর্তন আনতে পারে। আর এতে করেই আরও গতিশীল হবে জনসাংবাদিকতার প্রসার-প্রক্রিয়া।
লেখক – মোহন মিন্টু
সহকারী সম্পাদক
দৈনিক আজকের চট্টগ্রাম
ও
সম্পাদক
খাসখবর ডট নিউজ
চট্টগ্রাম।
খখ/মো মি


