খুলে দেওয়া হলো ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’

thai foods

খাসখবর চট্টগ্রাম ডেস্ক: আজ ২৯ অক্টোবর ভোর ৬টায় বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। খুলে দেওয়া হলো ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’। আনোয়ারা প্রান্তে টোল প্লাজায় ২৫০ টাকা টোল দিয়ে টানেল পাড়ি দিয়ে পতেঙ্গা প্রান্তে বেরিয়ে এলো সাদা মাইক্রোবাস। সেই গাড়ি দিয়েই টানেলে সাধারণ যানবাহন চলাচলের নতুন যাত্রা শুরু। এভাবেই টানেল পার হয়েছে শত, শত গাড়ি।

thai foods

উচ্ছ্বসিত গাড়ির চালকরা, যাত্রীরাও। কেউ বলেছেন, টানেলের ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে তাদের মনে হয়েছে তারা ইউরোপের মধ্যে আছেন। আবার কেউ বলেছেন, ‘আমাদের দেশটা বিদেশ হয়ে গেছে’।

রোববার (৩০ অক্টোবর) ভোরে টানেল পাড়ি দেয়ার প্রতীক্ষায় রাত থেকেই যানবাহনের ভিড় জমে। প্রথম টানেল পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস গড়ার প্রতীক্ষায়ও ছিলেন কেউ কেউ।

বিএনপি-জামায়াতের ডাকা হরতালের মধ্যে টানেল খুলে দেওয়া এবং যানবাহন চলাচল নিয়ে সংশয় ছিল। তবে খুলে দেওয়ার প্রথম দু’ঘণ্টার মধ্যেই শতাধিক গাড়ি টানেল অতিক্রম করে এবং প্রায় ৩০ হাজার টাকা টোল আদায় হয় বলে জানা গেছে।

খোলার প্রথমদিনে একেবারে শুরুতে যানবাহনের চাপ বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। শুরুতে ব্যক্তিগত যানবাহনই বেশি দেখা গেছে, যাদের অনেকেই বিমানবন্দরের যাত্রী। দূরপাল্লার বাস কিংবা পণ্যবাহী পরিবহন তেমন ছিল না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরতালের কারণে ঢাকা থেকে কক্সবাজারমুখী দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী পরিবহন কিছুটা কম চলাচল করছে।

দুবাই প্রবাসী পটিয়ার শাহরিয়ার আলম শুধুমাত্র টানেল দিয়ে বাড়ি যাবার জন্য দেশে ফেরা একমাস পিছিয়ে দেন বলে জানালেন। তিনি রোববার সকালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে মাইক্রোবাসে চড়ে পতেঙ্গা প্রান্ত দিয়ে টানেলে প্রবেশ করেন, সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা।

কক্সবাজার থেকে আসা পণ্যবোঝাই প্রাইম মোভার এক হাজার টাকা টোল দিয়ে আনোয়ারা প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে টানেলে। সেটি পতেঙ্গা দিয়ে বের হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। লরিচালক ফিরোজ বলেন, ‘আগে তো আনোয়ারা পর্যন্ত এসে কর্ণফুলী, মইজ্জ্যারটেক হয়ে নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু) পার হতে হতো। তারপর শহরের ভেতরে আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক চালিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে উঠতে হতো। এখন আনোয়ারা থেকেই সরাসরি পতেঙ্গা হয়ে ফৌজাদরহাট গিয়ে হাইওয়েতে উঠতে পারছি। সময় দু’ঘণ্টা কম লেগেছে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘টানেল ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। গভীর রাতে যানবাহন চলাচল সাধারণত কম থাকে। তখন লেন কমিয়ে দেওয়া হবে। এরপরও কোনো যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হবে না। টানেলের ভেতরে গতি যাতে ৬০ কিলোমিটার থাকে, কোনো যানবাহন যাতে ধীরগতি না হয় বা দাঁড়িয়ে না থাকে, দুই চাকা ও তিন চাকার কোনো যানবাহন যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেটা আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং করছি।’

হরতাল আহ্বানের কারণে টানেলের আনোয়ারা ও পতেঙ্গা উভয়প্রান্তে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। আর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব যথারীতি নৌবাহিনীর সদস্যরা পালন করছেন।

গতকাল শনিবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে নগরীর পতেঙ্গা প্রান্তে বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বেলা ১২টা ২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী গাড়িবহর নিয়ে নিজ হাতে টোল পরিশোধ করে টানেল পার হন। মাত্র তিন মিনিটে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের টানেল পাড়ি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হন দক্ষিণ প্রান্তে কর্ণফুলী উপজেলার কোরিয়ান ইপিজেড মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায়। জানা গেছে, এদিন প্রধানমন্ত্রীর বহরে ২১টি গাড়ি ছিল। প্রধানমন্ত্রী মোট ৪ হাজার ২০০ টাকা টোল পরিশোধ করেন।

বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য গত আগস্টে টোল হার চূড়ান্ত করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ। রোববার (২৯ অক্টোবর) টানেল খুলে দেয়ার দিন থেকে সেটি কার্যকর হয়েছে।

টানেলের মধ্য দিয়ে যেতে হলে ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার), জিপ ও পিকআপকে দিতে হচ্ছে ২০০ টাকা করে। আর মাইক্রোবাসের জন্য দিতে হবে ২৫০ টাকা। ৩১ বা এর চেয়ে কম আসনের বাসের জন্য ৩০০ এবং ৩২ বা তার চেয়ে বেশি আসনের জন্য ৪০০ টাকা টোল দিতে হচ্ছে। টানেলে দিয়ে যেতে হলে ৫ টন পর্যন্ত ট্রাককে ৪০০ টাকা, ৫ দশমিক ১ টন থেকে ৮ টনের ট্রাককে ৫০০, ৮ দশমিক ১ টন থেকে ১১ টনের ট্রাককে ৬০০ টাকা টোল দিতে হবে। তিন এক্সেলবিশিষ্ট ট্রাক-ট্রেইলরের টোল চূড়ান্ত করা হয়েছে ৮০০ টাকা। চার এক্সেলের ট্রাক-ট্রেইলরকে দিতে হচ্ছে ১০০০ টাকা। এর বেশি ওজনের ট্রাক-ট্রেইলরকে প্রতি এক্সেলের জন্য ২০০ টাকা করে অতিরিক্ত দিতে হবে।

উল্লেখ্য, কর্ণফুলী নদীর দুইতীরে চীনের সাংহাই সিটির আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এ টানেল নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের তত্ত্বাবধানে টানেলের নির্মাণ কাজ করেছে চীনা কোম্পানি ‘চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’।

৩.৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুই সুড়ঙ্গপথের এই টানেলে প্রতিটি টিউব বা সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২.৪৫ কিলোমিটার, ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতা। টানেলে দু’টি টিউব দিয়েই যানবাহন চলাচল করবে। একটির সঙ্গে অপর টিউবের দূরত্ব ১২ মিটারের মত। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেইন তৈরি করা হয়েছে। টানেলের পূর্ব ও পশ্চিম ও প্রান্তে থাকছে ৫.৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক।

এছাড়া ৭২৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ওভারব্রিজ রয়েছে আনোয়ারা প্রান্তে। এ প্রান্তেই রয়েছে টোলপ্লাজা। উভয় দিকেই আছে ওজন স্কেল। ভোর থেকে বঙ্গবন্ধু টানেলে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। সকাল ৮টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টায় ১২১টি ছোট-বড় গাড়ি টানেল ব্যবহার করেছে।

খখ/মো মি

আগেকর্ণফুলী নদী থেকে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার
পরেবঙ্গবন্ধুকে মরণোত্তর ‘ডক্টর অব লজ’ ডিগ্রি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়