কুমার মণিদীপ্ত, খাসখবর বিশেষ ডেস্ক: বেশ কয়েকদিন আগেও সংসার চালানোর জন্য অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। সকালে দু’টি বাড়িতে কাজ সেরে বিকেলে বেরিয়ে পড়তেন রাজনৈতিক প্রচারে। হাতে ছিল না অর্থ, ছিল না কোনও প্রভাবশালী রাজনৈতিক বংশপরিচয়। ছিল শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর মানুষের প্রতি আস্থা। পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামের সেই কলিতা মাজিই আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিমন্ত্রী।
সোমবার (১ জুন) লোক ভবনে শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভার বাকি ৩৫ জন সদস্য শপথ নেন। সেই তালিকায় ছিলেন পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামের বিধায়ক কলিতা মাজি।
আউশগ্রামের সাধারণ ঘরের মেয়ের এই উত্থান এখন গোটা রাজ্যের আলোচনার বিষয়। সম্প্রতি আউশগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে প্রথমবার বিধায়ক হন বিজেপি নেত্রী কলিতা মাজি। আর এবার লোকভবনে অনুষ্ঠিত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ১৯ জন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে শপথ নিলেন তিনিও।

একসময় মাসে ২৫০০ টাকা বেতনে কাজ করা গৃহপরিচারিকার জীবন থেকে মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার এই যাত্রা যেন এক বাস্তব রূপকথা।
রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ২০১৪ সালে বুথ কর্মী হিসেবে দলীয় কাজ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দায়িত্ব বাড়তে থাকে। নগর সম্পাদিকা থেকে জেলা কমিটির সদস্য, পথ চলতে চলতে মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
কলিতার স্বামী সুব্রত মাঝি কলের মিস্ত্রি। তবে সংসারে বাড়তি কিছু উপার্জনের জন্য গৃহ পরিচারিকার কাজ করতে হয়েছে কলিতাকে। এক পুত্র এবং স্বামী নিয়ে তার সংসার। এ বছরই তার পুত্র পার্থ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা কলিতার অনেক দিনেরই। সেই সুযোগ চলে আসে বিজেপির হাত ধরে।

বছর সাতেক রাজনীতি করার পরে ২০২১ সালে তাকে প্রথম বার বিধানসভা ভোটে প্রার্থী করে বিজেপি। সে বার কলিতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৃণমূলের অভেদানন্দ থান্ডার। ১১ হাজার ৮১৫ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন কলিতা। এ বারও তার উপর ভরসা রেখেছিল বিজেপি। আউশগ্রাম থেকে টিকিট দেওয়া হয় কলিতাকে।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই ছিল কলিতার মূলচালিকা শক্তি। রাজনৈতিক লড়াইয়ে অর্থবল ও পেশিশক্তির মোকাবিলা করেও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন তিনি। শেষপর্যন্ত আউশগ্রামের মানুষের রায়ে জয় পান কলিতা।
দলের প্রতি নিষ্ঠা এবং মাঠে নেমে কাজ করার মানসিকতাই তাঁকে আজকের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের অনেকেই। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কলিতা মাজি।
তিনি বলেন,”আমরা কোনও দিন আশাই করিনি, স্বপ্নও দেখিনি যে আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পারব। আমার দল আমার উপর ভরসা করেছে। কী দেখে করেছে জানি না, কিন্তু যে আস্থা রেখেছে, তার জন্য আমি খুশি এবং কৃতজ্ঞ।”
ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও তাঁর কথায় ধরা পড়েছে বিনয়। মন্ত্রী হিসেবে প্রথম কাজ কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এখন গোটা পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে আছি। দূর থেকে কিছু বলা সম্ভব নয়। আমার দল যেভাবে দায়িত্ব দেবে, যে নির্দেশ দেবে, আমি সেই নির্দেশ মেনেই কাজ করব।”
একজন সাধারণ গৃহপরিচারিকার মন্ত্রী হয়ে ওঠার এই গল্প ইতিমধ্যেই বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। সেই প্রসঙ্গ উঠতেই কলিতা বলেন, “একদমই তাই। এই জায়গাটা দিতে পারে শুধু ভারতীয় জনতা পার্টি এবং মোদিজি।” আর্থিক অনটন, সামাজিক লড়াই, রাজনৈতিক সংগ্রাম সব বাধা অতিক্রম করে আজ রাজ্যের প্রতিমন্ত্রীর আসনে বসেছেন আউশগ্রামের কলিতা মাজি। তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি রাজনৈতিক উত্থানের গল্প নয়, বরং প্রমাণ করে যে ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং মানুষের সমর্থন থাকলে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পথও পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তার কথায়, ‘আমি গরিব পরিবারের একজন বধূ। তাই গরিব মানুষের কষ্ট বুঝি। বিধায়ক হয়েছি, এখন মন্ত্রীও হয়েছি, কিন্তু আমি সাধারণ মানুষ হিসেবেই থাকতে চাই। আমি আতিশয্য চাই না। আউশগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’
কলিতার এই উত্থানে খুশি গুসকরার মানুষেরাও। পাত্র পরিবারে এক সময় গৃহ পরিচারিকার কাজ করতেন কলিতা। সেই পরিবারের সদস্যেরা জানান, ২০১১ সাল থেকে তাদের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন কলিতা।
প্লাটিলাল পাত্র বলেন, ‘আগে আমাকে কাকা বলত। পরে আমাদের মেয়ে মারা যাওয়ার পর আমাকে বাবা বলে ডাকত। ও শুধু মেয়েই নয়, আমাদের অভিভাবকের মতো। ও মন্ত্রী হওয়ায় আমরা খুবই খুশি। মানুষের পাশে থেকে ভাল কাজ করুক, এটাই চাই।’
আউশগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি আজ শুধুমাত্র একজন মন্ত্রী নন, বরং সংগ্রাম থেকে সাফল্যের এক জীবন্ত প্রতীক। পরিচারিকার হাত থেকে মন্ত্রীর শপথ, কলিতার এই যাত্রা আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
খখ/মো মি


