অধ্যাপক অঞ্জন দাশ: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব, যোগমায়া ও জন্মক্রমের বিস্তারিত বর্ণনাসহ দর্শন ও মাহাত্ম্য
ভারতীয় সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী এক মহান ও পবিত্র উৎসব। এটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ পরমব্রহ্মের পূর্ণাবতার। তাঁর আবির্ভাব কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনা নয়, বরং ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অধর্মের বিনাশ এবং ভক্তির পথের উন্মোচন। জন্মাষ্টমী তাই ভক্তি, প্রেম, ন্যায় ও আত্মজ্ঞানের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র।
জন্মাষ্টমীর দর্শন:
জন্মাষ্টমীর দর্শন গভীর ও বহুমাত্রিক। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান স্বয়ং বলেছেন—
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥”
অর্থাৎ, যখনই ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের উত্থান ঘটে, তখনই আমি আত্মপ্রকাশ করি। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব এই মহান সত্যের জীবন্ত প্রমাণ।
দর্শনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো—
অবতারতত্ত্ব: শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণাবতার। তিনি যুগের প্রয়োজনে ধর্মরক্ষা ও ভক্তরক্ষার জন্য অবতীর্ণ হন।
লীলার রহস্য: ভগবানের জন্ম, বাল্যলীলা, রাসলীলা—সবই তাঁর দিব্যলীলা। এটি জগতকে শেখায় যে, জগতের সব ঘটনাই ভগবানের ইচ্ছার খেলা।
ভক্তিযোগ: জন্মাষ্টমী ভক্তির পথকে সরল করে। নামস্মরণ, কীর্তন ও আত্মসমর্পণই পরম গতি।
ধর্ম ও অধর্মের দ্বন্দ্ব: কংসের অত্যাচার ও কৃষ্ণের জয়—এটি সত্যের চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক।
মায়া ও যোগমায়ার ভূমিকা: ভগবান যোগমায়ার সাহায্যেই তাঁর লীলা সম্পন্ন করেন। মায়া ভগবানেরই শক্তি।
এই দর্শন আমাদের শেখায় যে, ভগবান সর্বদা ভক্তের সঙ্গে থাকেন এবং সত্য-ধর্ম-প্রেমের পথে চললেই জীবন সার্থক হয়।
শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব ও জন্মক্রমের বিস্তারিত বর্ণনা: মথুরায় কংস নামক এক অত্যাচারী রাজা রাজত্ব করত। তাঁর বোন দেবকী ও দেবর বসুদেবের বিবাহের সময় আকাশবাণী হয় যে, দেবকীর অষ্টম সন্তান কংসকে বধ করবে। এই ভয়ে কংস দেবকী ও বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করে রাখে এবং জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক সন্তানকে হত্যা করতে থাকে।
জন্মক্রম বিস্তারিতভাবে এইরূপ: ১. প্রথম থেকে ষষ্ঠ সন্তান: দেবকীর প্রথম ছয়টি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই কংস তাদের হত্যা করে। এঁরা ছিলেন পূর্বজন্মের মরীচি ঋষির ছয় পুত্র, যারা হিরণ্যকশিপুর শাপে এইভাবে জন্মেছিলেন।
২. সপ্তম সন্তান – বলরাম (সঙ্কর্ষণ): সপ্তম গর্ভে ভগবানের অংশস্বরূপ শেষনাগ বলরাম জন্মগ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যোগমায়ার প্রভাবে সেই গর্ভ দেবকীর উদর থেকে সরিয়ে বসুদেবের অন্য পত্নী রোহিণীর গর্ভে স্থাপন করা হয়। ফলে বলরাম গোকুলে রোহিণীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। এজন্য তাঁকে সঙ্কর্ষণও বলা হয়।
৩. অষ্টম সন্তান – শ্রীকৃষ্ণ: ভাদ্র কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির মধ্যরাতে দেবকীর অষ্টম গর্ভে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কারাগারের দ্বার খুলে যায়, পাহারাদাররা ঘুমিয়ে পড়ে এবং দিব্যজ্যোতি ছড়িয়ে পড়ে। নবজাতক চতুর্ভুজ বিষ্ণুরূপে প্রকাশিত হয়ে দেবকী-বসুদেবকে আশীর্বাদ করেন, তারপর সাধারণ শিশুরূপ ধারণ করেন।
৪. যোগমায়ার জন্ম: ঠিক একই সময়ে গোকুলে নন্দরাজ ও যশোদার গৃহে যোগমায়া কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। যোগমায়া ভগবানেরই অংশস্বরূপ দিব্যশক্তি।
বসুদেব যোগমায়ার আদেশে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে যমুনানদী পার হয়ে গোকুলে পৌঁছান এবং যশোদার কন্যা যোগমায়াকে নিয়ে ফিরে আসেন। কংস সেই কন্যাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে যোগমায়া দিব্যরূপ ধারণ করে আকাশবাণী করেন—“হে মূঢ়! তোমার বধকারী অন্যত্র জন্মগ্রহণ করেছেন।” এইভাবে যোগমায়া তাঁর লীলা সম্পন্ন করে অন্তর্ধান হন।
এই জন্মক্রমে দেখা যায়, ভগবান তাঁরই শক্তি যোগমায়ার মাধ্যমে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ধরিতলতে অবতীর্ণ হন।
জন্মাষ্টমীর বিশেষত্ব ও পালনপ্রণালী: জন্মাষ্টমীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মধ্যরাতের পূজা। ভক্তরা সারাদিন উপবাস থেকে মধ্যরাতে কৃষ্ণমূর্তির অভিষেক, অলঙ্করণ, ভোগার্পণ ও আরতি করেন। গোকুলে-বৃন্দাবনে রাসলীলা, মহারাষ্ট্রে দধি-হান্ডি, বাংলায় কীর্তন ও শোভাযাত্রা—এসব এই উৎসবকে সমৃদ্ধ করে। শিশুদের কৃষ্ণবেশ ধারণ করে নৃত্যগীতের আয়োজন হয়। মন্দির ও ঘরে ঘরে তুলসী, পুষ্প ও আলোয় সাজানো হয়।
তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য: জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য হলো অধর্মের বিনাশ ও ধর্মের পুনরুত্থান। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব প্রমাণ করে যে, ভগবান ভক্তের রক্ষাকর্তা। এই তিথিতে নামস্মরণ, ভজন ও উপবাস করলে অশেষ পুণ্য লাভ হয়। যোগমায়ার লীলা আমাদের শেখায় যে, ভগবানের মায়াই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। বলরাম ও কৃষ্ণের একসঙ্গে আবির্ভাব ভ্রাতৃত্ব ও শক্তির প্রতীক।
মাহাত্ম্যের দিক থেকে জন্মাষ্টমী অত্যন্ত মহিমান্বিত। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও ভগবৎপ্রেমের পথ। শ্রীকৃষ্ণের বাণী “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ” আজও মানুষকে শরণাগতির পথ দেখায়।
শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী ভগবানের শুভ আবির্ভাব, যোগমায়ার দিব্যলীলা এবং ধর্মের চিরন্তন জয়ের স্মারক। প্রথম ছয় ভাইয়ের বলিদান, বলরামের সঙ্কর্ষণ, শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এবং যোগমায়ার প্রকাশ—এই সম্পূর্ণ জন্মক্রম ভগবানের অপরূপ লীলার পরিচয় বহন করে। জন্মাষ্টমীর দর্শন আমাদের শেখায় যে, ভক্তি, প্রেম ও ধর্মের পথে চললেই জীবন সার্থক হয়। প্রতি বছর এই পবিত্র তিথিতে যখন ভক্তরা “হরে কৃষ্ণ” নাম গান করেন, তখন যেন বৃন্দাবনের দিব্যস্মৃতি জেগে ওঠে।
খখ/মো মি


