মোহন মিন্টু: দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হিন্দু ধর্মের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আজ জন্মতিথি। এই মহাপুণ্য তিথিতে কংসের কারাগারে বন্দি দেবকী ও বাসুদেবের বেদনাহত ক্রোড়ে জন্ম নিয়েছিলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।
আজ হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব-শুভ জন্মাষ্টমী। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হয়েছিলেন ।
পৃথিবী থেকে দুরাচারী দুষ্টদের দমন আর সজ্জনদের রক্ষার জন্যই তাদের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দিনে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগমন হয়েছিলেন। পাশবিক শক্তি যখন সত্য, সুন্দর ও পবিত্রতাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন সেই অসুন্দরকে দমন করে জাতিকে রক্ষা এবং শুভশক্তিকে প্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে।
হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। উৎসবটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, প্রতি বছর মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো এক সময়ে পড়ে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, পাশবিক শক্তি যখন ন্যায়নীতি ও সত্যকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন মানবকল্যাণ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য মহাবতার শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। এ উপলক্ষে আজ দেশজুড়ে মন্দির ও ধর্মীয় স্থানে নানা আয়োজনে উদ্যাপিত হচ্ছে জন্মাষ্টমী।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি ও ইসকনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আজ শুক্রবার সরকারি ছুটি। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনসহ বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে সম্প্র্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠান।
শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ ও বেলা ৩টায় ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমী মিছিল ও রাতে শ্রীকৃষ্ণ পূজা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে আয়োজিত গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করবেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন। আজ বেলা ৩টায় পলাশীর মোড়ে ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের উদ্বোধনী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর এই ঐতিহাসিক মিছিল প্রতি বছরের মতোই জগন্নাথ হল, শহিদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড়, বঙ্গবাজার, গোলাপশাহ মাজার হয়ে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এ উপলক্ষে গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, ভজন কীর্তন, ভোগ আরতি, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় নাটক কীর্তন মেলা।
জন্মাষ্টমীতে চট্টগ্রামে ৪ দিনের নানা আয়োজন: পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মতিথি স্মারক জন্মাষ্টমী উপলক্ষে চট্টগ্রামে চার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি। আজ ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক মহাশোভাযাত্রা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পূজা ও ভোগরাগ, ধর্মমহাসম্মেলন, সাধু বৈষ্ণব সম্মেলন, ষোড়শপ্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা ও মাতৃ সম্মেলন।
গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে নগরের জেএমসেন হলস্থ শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কর্মসূচির তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবিও জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক লায়ন আর. কে. দাশ রুপু।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ৯টায় নগরের আন্দরকিল্লা মোড় থেকে ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমী মহাশোভাযাত্রা বের হবে। সারাদেশেও জন্মাষ্টমীর দিন শোভাযাত্রাসহ নানা মাঙ্গলিক আয়োজন থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার বলেন, চার দিনব্যাপী জাতীয় জন্মাষ্টমী অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ৪ সেপ্টেম্বর সকালে মহাশোভাযাত্রায় প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। উদ্বোধক থাকবেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। মাঙ্গলিক উদ্বোধক থাকবেন বাঁশখালী ঋষিধামের মোহন্ত মহারাজ স্বামী সচিদানন্দ পুরী।
তিনি জানান, মহাশোভাযাত্রায় আরও উপস্থিত থাকবেন এরশাদ উল্লাহ এমপি, পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য লায়ন হেলাল উদ্দিন, ট্রাস্টি দীপক কুমার পালিতসহ সাধু-বৈষ্ণবরা।
এদিন বিকেলে ধর্মমহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমপি। উদ্বোধক থাকবেন কৈবল্যধামের মোহন্ত মহারাজ শ্রীমৎ কালীপদ ভট্টাচার্য। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন করবেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, চট্টগ্রামের অধ্যক্ষ স্বামী শক্তিনাথানন্দজী।
ধর্মমহাসম্মেলনে সংবর্ধিত অতিথি থাকবেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মাহবুবের রহমান শামীম। বিশেষ অতিথি থাকবেন এরশাদ উল্লাহ এমপি, সরওয়ার জামাল নিজাম এমপি ও সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার হরিশ কুমার প্রমুখ।
১৫ দফা দাবি: সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের আলোকে সকল ধর্মের মানুষের মতো হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাতিগত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং বৈষম্যমূলক সব আইন বিলুপ্ত করা।
এ ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন স্তরে হিন্দুদের অধিকার নিশ্চিত ও পদায়নে বৈষম্য বন্ধ, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও হত্যার বিচার করতে বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন, ধর্মীয় সভার নামে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের আইনের আওতায় আনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সাইবার আইনে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত হিন্দুদের মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিও জানানো হয়েছে।
দাবির মধ্যে আরও রয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবে তিন দিনের সরকারি ছুটি বাস্তবায়ন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে রূপান্তর, সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, মন্দির ও প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থায়নে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পুনর্নির্মাণ, সংসদে হিন্দুসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর জন্য সংখ্যানুপাতিক আসন সংরক্ষণ, দেশের প্রতিটি জেলায় মডেল মন্দির নির্মাণ এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় এর বিস্তৃতি ঘটানো। পাশাপাশি সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সনাতনী স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করারও দাবি জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লায়ন আর. কে. দাশ রুপু বলেন, শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী মহোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাণপ্রিয় অনুষ্ঠান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক ও সমাজকল্যাণমুখী কর্মের স্মারক হিসেবে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। গত ৪৩ বছর ধরে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন করে আসছে সংগঠনটি। চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক এবং দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ১৩৯০ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশের একটি ধর্মীয়, সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে। চট্টগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের ৫৬টি জেলায় সংগঠনের শাখা কমিটি গঠিত হয়েছে। সংগঠনটি তার অরাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখেছে।
‘শ্রীকৃষ্ণানুগত্য, স্বদেশপ্রেম ও মানবসেবা’কে সংগঠনের আদর্শ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে সামাজিক মহামিলনের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চান তারা। মানুষ যেন নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে এবং সব বিভেদ ভুলে দেশের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহসভাপতি লায়ন তপন কান্তি দাশ, প্রকৌশলী আশুতোষ দাশ, অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জী, বিদ্যালাল শীল, কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থ, মহাশোভাযাত্রা উপকমিটির আহ্বায়ক ও দক্ষিণ জেলার সভাপতি বাবুল ঘোষ বাবুন, সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস, উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুভাষ গুহ, অর্থ সম্পাদক রতন আচার্য, প্রচার সম্পাদক এস প্রকাশ পাল, মহিলা সম্পাদিকা দীপ্তি দাশ, রাসেল চৌধুরী ও উপমহিলা সম্পাদিকা দ্বিপতি দাশ দিপাসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, সনাতনীদের অধিকার আদায়ে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ সবসময় রাজপথে ছিল। সংগঠনটির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদ সরকারের সময়ে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে একদিনের সরকারি ছুটি, অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইন এবং হেবা আইনে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য জমি নিবন্ধনের আইন পাসসহ বিভিন্ন অর্জন হয়েছে। কোথাও অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন, অধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্যমূলক আচরণ ও কর্মকাণ্ড সংগঠিত হোক, তা তারা চান না। সব ধর্মের মানুষের অধিকার ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করে দেশকে এগিয়ে নিতে তারা কাজ করে যেতে চান।
খখ/মো মি


