খাসখবর গণমাধ্যম ডেস্কঃ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দূর্নীতির রিপোর্ট করায় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের সাথে অন্যায় করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন। মঙ্গলবার (১৮ মে) আদালতে তোলার প্রাক্কালে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিমের আদালতে নেওয়ার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে রোজিনা ইসলাম বলেন, ‘আমার সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে, আমার সাথে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট করায় আমাকে অন্যায় ভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।’
অনুমতি ছাড়া করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের সরকারি নথির ছবি তোলার অভিযোগে দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন খারিজ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ সকাল পৌনে ৮টার দিকে শাহবাগ থানা থেকে তাকে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে নেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টার পর তাকে আদালতে তোলা হয়। এ সময় পরবর্তী তদন্তের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুর রহমান সরদার।
গতকাল প্রথম আলো পক্ষ থেকে জানানো হয়, রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য সোমবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। তাকে সেখানে একটি কক্ষে ৫ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় এবং তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তার পরিবার তাকে হাসপাতালে নিতে চাইলেও তা দেয়নি পুলিশ।
রাতে শাহবাগ থানায় অফিশিয়াল সিক্রেট আইনের (১৯২৩) ৩ ধারায় তার নামে মামলা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি করেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব ডা. মো. শিব্বির আহমেদ উসমানী।
এর আগে, সোমবার (১৭ মে) বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান রোজিনা ইসলাম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, করোনার ভ্যাকসিন ক্রয়, সংগ্রহ সংক্রান্ত গোপনীয় নথি নাড়াচাড়া ও শরীরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এ সব নথি জনগণের সামনে এলে অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
তবে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম দাবি করেছেন, সচিবের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি পিএস সাইফুল ইসলামের রুমে অপেক্ষা করছিলেন। এসময় পিএস সাইফুল ইসলাম নথিপত্র গায়েবের অভিযোগ তুলে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
একপর্যায়ে একজন পুলিশ কনস্টেবল ডেকে তার শরীরে হাত দেন। তাকে সাজানো অভিযোগে পিএস আটকে রাখে বলে দাবি করে তিনি বলেন, তিনি কোনো নথিপত্র নেননি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম প্রধান পরে রাত ৯টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম সচিবের পিএসের রুমে ঢুকে মোবাইলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল-নথির ছবি তোলেন। আর কিছু কাগজপত্র তিনি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন অতিরিক্ত সচিব, পুলিশের একজন সদস্য দেখে তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, এটা নিয়ে যেতে পারেন না। তখন পুলিশকে জানানোর পর মহিলা পুলিশ এসেছে। তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপ-সচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী শাহবাগ থানায় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি নথিপত্র সরানোর অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এ বিষয়ে, রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান গনমাধ্যম কর্মীদের জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে রোজিনাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, উনি সরকারি গোপন নথি সরাচ্ছিলেন। ওনার দেহ তল্লাশি করে নথি পাওয়া গেছে। রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় অফিশিয়াল সিক্রেট আইনের (১৯২৩) ৩ ধারায় মামলা হয়েছে।
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টঃ
অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এ আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ স্থানে যদি কেউ যায় বা যেতে উদ্যত হয় কিংবা ওই স্থানের কোনো নকশা বা স্কেচ তৈরি করে বা কোনো গোপন তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করে তবে সে অপরাধী হবে। ৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ স্থানের কোনো ফটো, স্কেচ বা নক্সা কেউ প্রকাশ করতে পারবে না। ৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো বিদেশি এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা যাবে না। ৫ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি গোপনে কোনো সংবাদ পেয়ে থাকলে সেই সংবাদ প্রকাশ করতে পারবে না। কোনো সংবাদপত্র যদি কোনো গোপন সংবাদ প্রকাশ করে তবে প্রতিবেদক, সম্পাদক, মুদ্রাকর এবং প্রকাশক অপরাধী হবেন। এসব কাজে সহায়তা করা অপরাধ বলে গণ্য হবে।
৩৭৯/৪১১ এই ধারার অর্থ হলো,যদি কোন ব্যক্তি অন্যের অজান্তে কোন জিনিস চুরি করেন তবে ৩৭৯ ধারায় মামলা দেওয়া হয়,আর যদি উক্ত মালামাল সহ ঐ আসামিকে ধরা হয় বা গ্রেফতার করা হয় তবে ৪১১ ধারায় রিকভারি দেখানো হয় । এ ক্ষেত্রে আসামির সাজা হবেই বলে আইনে আছে ।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামঃ
সরকারি নথির ছবি তোলার অভিযোগে দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। এরপর প্রিজন ভ্যানে করে তাকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম ন্যায় বিচার পাবেন-আইনমন্ত্রী
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবেন। আমি পাবলিক প্রসিকিউশনকে বলেছি- মামলার খুঁটিনাটি বিষয় খতিয়ে দেখতে।
তিনি বলেন, এটা দুঃখজনক ঘটনা। বিষয়টি সহজেই সমাধান করা যেত। আমার উদ্যোগে রিমান্ড বাতিল ও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা হয়নি। রোজিনা ইসলাম অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবেন। তার মামলাটি সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম জামিন পাবেন-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
আগামী বৃহস্পতিবার (২০ মে) প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের জামিনের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
মঙ্গলবার (১৮ মে) দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোজিনাকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে। তাকে নানা ধরনের হেনস্তা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চেয়েছি, এ ধরনের হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই।’
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনঃ
দৈনিক প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে আটকে রেখে হেনস্তা করার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার (১৮ মে) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. সাইফুল্লাহিল আজমকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—উপসচিব (প্রশাসন-২ শাখা) মো. আবদুছ সালাম ও উপ-সচিব (জনস্বাস্থ্য-১) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মামলার বাদীর দপ্তর বদলঃ
এদিকে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী, মামলার বাদী স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানীর দপ্তর বদল করা হয়েছে। তাঁকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জনস্বাস্থ্য-১ অধিশাখা থেকে জনস্বাস্থ্য-২ অধিশাখায় পদায়ন করা হয়েছে। গত সোমবারের অফিস আদেশে এই বদলি করা হলেও আজ সেটি জানা যায়। একই আদেশে আরও পাঁচ কর্মকর্তার দপ্তর বদল করা হয়েছে।
খখ/মো মি


