খাসখবর ধর্ম ডেস্ক➤ সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আজ জন্মাষ্টমী। করোনার সংক্রমণ রোধে গত বছরের মতো এবারও দেশে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর মহাশোভাযাত্রা আয়োজন করা হচ্ছে না। সোমবার (৩০ আগস্ট) শুধু ধর্মীয় বিধি মেনে মন্দিরে পূজা, গীতাপাঠ ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
দ্বাপর যুগের সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হিন্দু ধর্মের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আজ শুভ জন্মতিথি। এই তিথিতে কংসের কারাগারে বন্দি দেবকী ও বাসুদেবের বেদনাহত ক্রোড়ে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। আজ হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব-শুভ জন্মাষ্টমী।
যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে আবশ্যিক সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রতিপালিত হবে। তবে চলমান করোনা মহামারির জন্য জন্মাষ্টমী উৎসব এবার সব ধরনের শোভাযাত্রা, র্যালি, মিছিল ইত্যাদি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল রবিবার মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবী থেকে দুরাচারী দুষ্টদের দমন আর সজ্জনদের রক্ষার জন্যই তাদের মহাবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই দিনে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আগমন করেন। হিন্দু পঞ্জিকা মতে, সৌর ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রাধান্য হয়, তখন জন্মাষ্টমী পালিত হয়। উত্সবটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, প্রতি বছর মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোনো এক সময়ে পড়ে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন মন্দিরে পূজা-অর্চনা, তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্তন ও তারকব্রহ্ম নামযজ্ঞের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্দিরের আয়োজকরা জানিয়েছেন, আজ সকালে ষোড়শ উপচারে পূজা শেষ করে প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
(কোন সময়ে রাখবেন জন্মাষ্টমীর উপবাস? উপবাস ভঙ্গের সময় ঠিক কখন? জেনে নিন কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী তারিখ ও শুভক্ষণ ঠিক কখন। জানুন পুরাণ অনুসারে এই দিনটির মাহাত্ম্য।
অষ্টমী তিথি শুরু হবে ২৯ অগাস্ট রাত ১১টা ২৬ মিনিটে।
অষ্টমী তিথির অবসান হবে ৩০ অগাস্ট রাত ২টোয়।)
জন্মাষ্টমীর মাহাত্ম্যঃ
পুরাণ অনুসারে পাঁচ হাজার বছর আগে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন শ্রীবিষ্ণুর অষ্টম অবতার কৃষ্ণ। তাঁর আবির্ভাব তিথি প্রতি বছর জন্মাষ্টমী নামে পালিত হয়। কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী ছাড়াও এই দিনটি গোকুলাষ্টমী নামেও পরিচিত। এই বছর ৩০ অগাস্ট পালিত হবে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। মথুরায় কংসের কারাগারে জন্ম হয় দেবকী ও বাসুদেবের অষ্টম গর্ভের সন্তান কৃষ্ণের। কংসের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টির রাতে যমুনা পেরিয়ে বৃন্দাবনে যশোদা ও নন্দের সংসারে কৃষ্ণকে রেখে আসেন বাসুদেব।
স্বয়ং বিষ্ণু কারাগৃহে উপস্থিত হয়ে দেবকী ও বাসুদেবকে দর্শন দেন এবং তাঁদের পূর্বজন্মের তপস্যা সম্পর্কে জানান। তার পুণ্যফলের জন্যই দেবকী ও বাসুদেবের কাছে তিন বার অবতার নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বিষ্ণু দেবকীকে জানান যে, প্রথম জন্মে বৃষ্ণীগর্ভ নামক এক পুত্র হয়। দ্বিতীয় জন্মে দেবকী যখন দেবমাতা অদিতি ছিলেন, তখন বিষ্ণু ছিলেন, তার পুত্র উপেন্দ্র, এবং তিনিই বামন অবতারে রাজা বলিকে উদ্ধার করেন। এবার তৃতীয় জন্মে দেবকীর পুত্র কৃষ্ণ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে তাঁর প্রতিশ্রুতি পুরো করেন বিষ্ণু।
জন্মাষ্টমী ২০২১ তারিখ ও পুজোর সময়ঃ
এই বছর ৩০ অগাস্ট সোমবার পালিত হবে কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী। ৩০ তারিখেই পালন করতে হবে জন্মাষ্টমীর উপবাস। রাত ১২টায় ৩১ তারিখ শুরুর পরেই ভঙ্গ করতে হবে উপবাস। কারণ ঠিক মধ্যরাতেই জন্ম হয় শ্রীকৃষ্ণের।
অষ্টমী তিথি শুরু হবে ২৯ অগাস্ট রাত ১১টা ২৬ মিনিটে। অষ্টমী তিথির অবসান হবে ৩০ অগাস্ট রাত ২টোয়। ৩০ অগাস্ট গোটা দিন এবং পুরো রাত ৩১ অগাস্ট সকালে ৯টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হবে রোহিনী নক্ষত্র।
জন্মাষ্টমী পালনঃ
গোটা বিশ্বজুড়েই কৃষ্ণভক্তেরা এই দিনটি সাড়ম্বরে পালন করেন। পুরাণ অনুসারে বিষ্ণুর মানব অবতারের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ছিলেন কৃ্ষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের জীবনকথা নিয়ে বহু কাহিনি, উপ-কাহিনি, লোককথা প্রচলিত আছে। জন্মের পর থেকেই কৃষ্ণকে ভগবান হিসেবে পুজো করা শুরু হয়ে যায়।
ভগবদ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘যখনই অসত্য ও পাপে এই পৃথিবী ভরে যাবে, তখনই ধর্ম রক্ষা করতে ও সত্য প্রতিষ্ঠা করতে আমি এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হব।’ জন্মষ্টমী হল অশুভকে বিনাশ করে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার উত্সব। বিশ্বাস ও একতা ধরে রাখতে উত্সাহ দেয় এই উত্সব।
জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে শশা নিবেদন করার প্রথা রয়েছে। মনে করা হয় শশা পেলে অত্যন্ত প্রীত হন নন্দলাল। যে ভক্ত তাঁকে শশা নিবেদন করেন তাঁর যাবতীয় দুঃখ কষ্ট তিনি মোচন করেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। জন্মাষ্টমীতে ঠিক রাত ১২টায় কৃষ্ণের জন্মক্ষণে শশা কাটতে হয়। এটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মায়ের থেকে নড়ি গ্রন্থি কাটার রূপক বলে মনে করা হয়।
জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ-বাংলাদেশ’র কর্মসূচিঃ
শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ-বাংলাদেশ রোববার (২৯ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজন করে সংবাদ সম্মেলনের।
এতে লিখিত বক্তব্যে শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ-বাংলাদেশ, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, ১৯৩০ বঙ্গাব্দে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের পথচলা শুরু হয়। ৩৮ বছর ধরে চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের ৫৫টি জেলায় পরিষদের শাখা কমিটি রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দুর্গত এলাকায় জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। করোনাকালীন সময়েও প্রায় ২০ লাখ টাকার খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সহিংসতার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে এই সংগঠন।
‘জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে এরশাদ সরকারের সময়ে একদিনের সরকারি ছুটি আদায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময়কালে পাওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইন পাশ ও হেবা আইনের ন্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য আইন পাশ এই সংগঠনের অন্যতম অর্জন। ’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবছর জন্মাষ্টমী উৎসবে খরচের অর্থ দিয়ে সারাদেশের মহানগর, জেলা ও উপজেলায় অসহায় মানুষ এবং অনাথালয়ে খাদ্যসামগ্রী, শিক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে। চট্টগ্রামে অনাড়ম্বরভাবে তিনদিনব্যাপী জন্মাষ্টমী উৎসব উদযাপন করা হবে। এসময় জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুকুমার চৌধুরীর পক্ষ থেকে সবাইকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানানো হয়।
জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সুহৃদ অমিত চৌধুরী বলেন, সোমবার (৩০ আগস্ট) সকাল ১০টায় বিভিন্ন মঠ-মন্দির ও আশ্রমে দুস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। জেএমসেন হলে কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ শক্তিনাথানন্দ মহারাজ। প্রধান অতিথি থাকবেন সাবেক চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। প্রধান আলোচক থাকবেন অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। বিকাল ৫টায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। প্রধান আলোচক থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। সন্ধ্যা ৭টায় মহাস্নান ও অভিষেক শেষে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) সকাল থেকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি শেষে বিকাল ৫টায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন চসিক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। প্রধান আলোচক থাকবেন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) পূজানুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ, শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, নামকীর্তনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে উৎসব।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুজিত কুমার বিশ্বাস, সাধন
ধর, বিমল দে, লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য্য, লায়ন তপন কান্তি দাশ, অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জি, রতন আচার্য্য, সুমন দেবনাথ, শ্রীপ্রকাশ দাশ অসিত, অমিত চৌধুরী, এস প্রকাশ পাল, লায়ন ডা. বিধান মিত্র, আশীষ চৌধুরী, সজল দত্ত, নিউটন কান্তি দে।
খখ/মো মি


