খাসখবর বিভাগীয় ডেস্কঃ নাটোরের গুরুদাসপুরে কলেজছাত্রকে বিয়ে করা শিক্ষিকা খায়রুন নাহারের (৪০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার স্বামী মামুন হোসাইনকে (২২) আটক করেছে পুলিশ।
রবিবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৭টায় নাটোর শহরের বলারিপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসা থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়।
খায়রুন নাহার গুরুদাসপুর খুবজীপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। মামুন নাটোর এন এস সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
শনিবার (১৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে গলায় ফাঁস নিয়ে শিক্ষিকা খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করেন মামুন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে শিক্ষিকা খায়রুন নাহার (৪০) মোবাইলে কথা বলতেন। এ বিষয়ে দ্বিতীয় স্বামী মামুন (২২) বহুবার নিষেধ করেছেন। কথা না শোনায় উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এ নিয়ে শনিবার (১৩ আগস্ট) স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটিও হয় মামুনের। এই ঘটনার জেরেই খায়রুন নাহার আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি মামুনের।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাত ৩টার দিকে মামুন প্রতিবেশীদের ডেকে এনে বলেন, তার স্ত্রী খায়রুন নাহার গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেশীরা তার ঘরে গিয়ে দেখতে পান খায়রুনের নিথর দেহ ঘরের মেঝেতে শোয়ানো। এতে তাদের সন্দেহ হলে মামুনকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার খুবজীপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার প্রথমে বিয়ে করেছিলেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়। প্রথম স্বামীর ঘরে এক সন্তানও ছিল। পারিবারিক কলহে সংসার বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। তারপর কেটে যায় অনেক দিন। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুকে) পরিচয় হয় ২২ বছরের যুবক মামুনের সঙ্গে। মামুনের বাড়ি একই উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের পাটপাড়া গ্রামে। নাটোর এন এস সরকারি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথমে পরিচয়; তারপর গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। ২০২১ সালের ২৪ জুন তাদের প্রথম পরিচয়। তারপর ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর তারা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৩ মাসের সম্পর্কে রয়েছে ভালোবাসার গভীরতা। আর এ গভীরতা থেকেই বিয়ে করেন তারা। ছয় মাস আগে বিয়ে করলেও তারা তা গোপন করেন। সম্প্রতি বিয়ের খবরটি ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসিম আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানিয়েছেন, ভোর ৪টার দিকে ঘর থেকে বের হয়ে বাথরুমে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে দেখেন, গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় সিলিংয়ে ঝুলছেন খায়রুন নাহার। হাতের কাছে ধারালো কিছু না পেয়ে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ওড়না পুড়িয়ে তাকে নিচে নামান।
মামুন আরও জানান, খায়রুন নাহার ৩৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন। বিভিন্ন জায়গায় ঋণ পরিশোধ করে থাকতো আট হাজার টাকা। গতকাল শনিবার খায়রুন নাহারের আগের পক্ষের ছেলে এসে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যায়। বাকি তিন হাজার টাকার মধ্যে বাড়িতে ছিল মাত্র এক হাজার টাকা।
ওসি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। লাশ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।’
নাটোর পুলিশ সুপার (এসপি) লিটন কুমার সাহা জানান, এ ঘটনার তদন্ত চলছে। দ্রুতই রহস্য উদঘাটন করা হবে।
এদিকে, নাটোর শহরের বলারীপাড়ায় বাড়া বাসা থেকে কলেজ শিক্ষিকা খায়রুন নাহার মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তার আত্মীয়-স্বজনরা। তবে দুপুর পর্যন্ত তার স্বামী মামুনের পক্ষের কাউকে দেখা যায়নি। এই মৃত্যুর বিষয়ে শিক্ষিকার স্বজনরা মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।
শিক্ষিকা-ছাত্র দম্পতির বিয়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর হলেও এ সংবাদ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয় চলতি বছরের ৩১ জুলাই। ওই ঘটনা ভাইরালের মাত্র ১৪ দিন পরই উদ্ধার হলো ওই শিক্ষিকার মরদেহ। এ ঘটনায় খাইরুন নাহারের স্বামী মামুনকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন।
মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষিকার ভাগ্নে নাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, মামুন মাদকাসক্ত। বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত তিনি পাঁচ লাখ টাকা এবং একটি মোটরসাইকেল নিয়েছেন। সম্প্রতি আরও দামি মোটরসাইকেল চেয়েছেন মামুন। এ নিয়ে তার খালা খায়রুন নাহার মানসিক চাপে ছিলেন। এ ছাড়া সম্প্রতি গুরুদাসপুরে মাদক নিয়ে কিছু বখাটের মধ্যে গোলমাল হয়। ওই ঘটনায় মামুন আসামি হয়েছেন। এসব বিষয় নিয়ে মানসিক ও পারিবারিক বিভিন্ন চাপে অশান্তিতে ছিলেন তার খালা। এই মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষিকার চাচাতো ভাই সাবের হোসেনের দাবি, বিয়ের ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর থেকে খায়রুন নাহারের আত্মীয়, সহকর্মী, পরিচিতজনরা বিভিন্ন সমালোচনা করেছেন। কেউ এটাকে পজিটিভ আবার কেউ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এ নিয়ে চাপে ছিলেন খাইরুন। তবে কী কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন তা তার বোধগম্য নয়। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, খাইরুনের আগের স্বামী বা সন্তানের পক্ষ থেকে কোনও চাপের বিষয় তারা শোনেননি।
ওই শিক্ষিকার বাবার বাড়ি গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড়ের স্থানীয় কাউন্সিলর শেখ সবুজ জানান, মেয়ের পরিবার অত্যন্ত ভালো। তবে ওই ছেলে মাদকাসক্ত বলে শোনা গেছে। এই মৃত্যুর রহস্য দ্রুত উন্মোচনের দাবি করেন তিনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা নাটোর পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার শরীফ উদ্দীন জানান, জেলা পুলিশ ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে। আর পিবিআই পুলিশ ওই ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে জেলা পুলিশ।
এ মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ জানিয়েছে, মামুনের মাদকের মামলায় আসামি হওয়া, বখাটেদের সঙ্গে মারামারি, নতুন মোটরসাইকেল চাওয়া, স্বজন ও প্রতিবেশীদের কটু কথা, সংসার চালানোয় টানাপোড়েন– এসব কারণে মানসিক চাপে ছিলেন শিক্ষিকা।
খখ/মো মি


