খাসখবর জাতীয় ডেস্কঃ বিশ্বে আধুনিক নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ মেট্রোরেল। অপেক্ষার পালা শেষ। অবশেষে আজ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে রাজধানীবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল। আর এর মাধ্যমে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বাংলাদেশ। লন্ডনে সর্বপ্রথম এই রেলব্যবস্থা চালু হয়। এবার তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম।
বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) সকালে দেশের প্রথম মেট্রোরেল পরিষেবার প্রথম ধাপের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধনের পরদিন থেকে সাধারণ যাত্রীরা চড়তে পারবেন। আপাতত উত্তরা থেকে দুরন্ত গতিতে মেট্রো যাবে আগারগাঁওয়ে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লাল ফিতা কেটে নগরীর সবচেয়ে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার প্রথম যাত্রী হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সকাল ১১টায় উত্তরার দিয়াবাড়িতে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে ডিএমটিসিএল। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা।
উদ্বোধনের পর রুটের মধ্যবর্তী স্টেশনে কোনো স্টপেজ ছাড়াই উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলবে মেট্রোরেল। পরদিন (বৃহস্পতিবার) থেকে যাত্রীরা মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে পারবেন।
রাজধানীবাসীসহ দেশের কোটি জনতা অপেক্ষা করছে মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন ৬) উদ্বোধনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্যে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্য, স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন স্মার্ট যানবাহন। পৃথিবী এগিয়ে চলেছে আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না।
প্রথম কয়েকদিন প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে ১০ মিনিট ধরে যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করবে মেট্রোরেলের ট্রেনগুলো। কারণ নগরবাসী এই নতুন পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নয়।
প্রাথমিকভাবে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ছয়টি বগিবিশিষ্ট ১০ সেট ট্রেন চলাচল করবে। আপাতত এই রুটে ধীরগতিতে ট্রেন চলবে। এ পর্যায়ে ট্রেন চলবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। পরে চলাচলের সময় বাড়ানো হবে এবং চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে। সম্পূর্ণভাবে মেট্রোরেল চলাচল শুরু হলে প্রতি সাড়ে তিন মিনিট অন্তর একটি ট্রেন চলবে।
প্রতিটি স্টেশনে, যাত্রীদের ওঠা ও নামা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ট্রেনটি অপেক্ষা করবে। প্রতিটি ট্রেন ২,৩০০ জন যাত্রী নিয়ে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। তবে বাঁকযুক্ত এলাকায় গতি কম হবে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল-কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ২১.২৬ কিলোমিটারের পুরো রুটটি ৪০ মিনিটেরও কম সময়ে ভ্রমণ করে মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০,০০০ যাত্রী বহন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে রেল প্রকল্পের জন্য ভায়াডাক্ট ইনস্টল করা শুরু করে বাস্তবায়ন সংস্থা।
উত্তরা ফেজ-৩ এবং পল্লবী, রোকেয়া সরণি, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, দোয়েল চত্বর এবং জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত এ মেট্রোরেল লাইনের দৈর্ঘ্য ২০.১ কিলোমিটার।
২০১৬ সালের ২৪ জুন মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা এমআরটি লাইন-৬ নামে পরিচিত।
পরে নগরীর আগারগাঁও পয়েন্টে এলিভেটেড ভায়াডাক্টের প্রথম অংশ এবং এমআরটি লাইন-৬ এর নয়টি স্টেশনের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
মোট ২২,০০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ১৬,৬০০ কোটি টাকা প্রকল্প সহায়তা প্রদান করেছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
উদ্বোধনের ফলে মেট্রোরেল শুধু মহানগরীর যানজটই কমাবে না, এর ফলে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম অংশ চালু হলেও আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দ্বিতীয় অংশ ২০২৩ সালের শেষ দিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আর মতিঝিল থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত বর্ধিতাংশ চালু হতে পারে ২০২৫ সালের মধ্যে।
সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দিয়েছেন, ২০৩০ সালে ছয়টি এমআরটি লাইন ঢাকায় তৈরি করা হবে।
ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল যা এমআরটি লাইন-৬ নামে পরিচিত, এই প্রকল্প সরকার হাতে নেয় ২০১২ সালে। এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের প্রথমে ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা।
পরে মতিঝিল থেকে কমলাপুর বাড়তি অংশ যোগ হওয়ায় ব্যয় বাড়ে ১১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তখন এ প্রকল্পে সর্বোমোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগী জাইকার করছে ১৯ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। আর সরকারি অর্থায়ন ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ পর্যায়ক্রমে তিন ধাপে শেষ করা হবে।
এমআরটি লাইন-৬ বাদে অন্য প্রকল্পের অগ্রগতিও হচ্ছে সময়মতো। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৮ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫: সাউদার্ন রুট, এমআরটি লাইন-২, এমআরটি লাইন-৪ ও এমআরটি লাইন-১ এর নির্মাণকাজ শেষ করা হবে।
এমআরটি লাইন-১
এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল দুইভাগে বিভক্ত। এই রুটে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেল নির্মিত হবে। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা।
এর মধ্যে জাপান সরকার দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, বাকি ১৩ হাজার ১১১ কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে।
এমআরটি লাইন-২
২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল সমন্বয়ে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ জিটুজি ভিত্তিতে পিপিপি পদ্ধতিতে এমআরটি লাইন-২ নির্মাণের লক্ষ্যে জাপান ও বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা স্মারক সই করেছে।
এমআরটি লাইন-৩
এটি মেট্রোরেল নয়, এটিকে বলা হচ্ছে মেট্রোরেল বিআরটি। এমআরটি লাইন ৩ এ প্রকল্পটি গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে।
এমআরটি লাইন-৪
এমআরটি লাইন-৪ এরও নির্মাণকাজ শেষ করা হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। পিপিপি পদ্ধতিতে কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল মেট্রোরেল হিসেবে এমআরটি লাইন-৪ নির্মাণের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন।
এমআরটি লাইন-৫
২০২৮ সালের মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত পাতাল ও উড়াল সমন্বয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে এর সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। মূল নকশা কাজের অগ্রগতি ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
খখ/মো মি


