খাসখবর অর্থনীতি ডেস্ক➤ দেশে সর্বকালের সর্বোচ্চ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে একরোনা মহামারিকালে। এসময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। আর এই খাত থেকে আগের অর্থবছরের চেয়ে তিন গুণ ঋণ নিয়েছে সরকার। বিদায়ি অর্থবছরে সরকারল সঞ্চয়পত্র থেকে নিট প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।
করোনার কারণে পৃথিবীব্যাপী আর্থিক সংকট বিদ্যমান। আর এই সংকটের মধ্যেই বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। আগের অর্থবছরের চেয়ে তিন গুণ বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। করোনার সময়ে একদিকে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে কর্ম হারানোর আশঙ্কা।
এমন পরিস্থিতিতে মানুষের আয় অনেক কমে গেছে। ফলে সঞ্চয়ও কমে যাওয়ার কথা। বাস্তবে ঘটেছে উলটোটা। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এত বেড়েছে যে সর্বকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হলো এই করোনার সময়ে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ বলা হয়। এ কারণে মানুষ এই মহামারির সময়ে ভবিষ্যত নিয়ে সঙ্কিত। এই সময়ে নিরাপদ জায়গায় বিনিয়োগ করাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে সাধারণ মানুষ। নিরাপদ জায়গা বিবেচনা ছাড়াও মুনাফার দিক থেকে ব্যাংকের চেয়ে বেশি পাওয়া যায় সঞ্চয়পত্র থেকে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এ খাতেই বেশি ঝুঁকেছেন।
বিদায়ি অর্থবছরে (২০২০-২১) সরকার আগের অর্থবছরের চেয়ে তিন গুণ বেশি ঋণ নিয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ি অর্থবছরে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে নিট প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর আগে কোনো বছরে এত বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়নি। সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হওয়ার কারণে সরকারের ওপর দায় বাড়ছে। এজন্য সরকার গত কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমানোর জন্য নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে গত দেড় বছর ধরে দেশে করোনার প্রকোপ চলছে। এমন পরিস্থিতিতেও প্রতি মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে।
আগের অর্থবছরগুলোর হিসাব দেখলে দেখা যায়, এর আগে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ঐ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিক্রি হয়েছিল ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হয়েছিল ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকার, যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকার।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের সর্বশেষ মাস জুনে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। মে মাসে ছিল ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা, এপ্রিল মাসে যা ছিল ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এর আগে মার্চ মাসে নিট ঋণ এসেছিল ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে ৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, নভেম্বরে ৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, অক্টোবরে ৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, আগস্টে ৩ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা এবং অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা নিট ঋণ এসেছিল সঞ্চয়পত্র থেকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে নিট বিক্রি বলা হয়। বিক্রির ঐ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এর বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নিলেও এই ঋণে বেশি সুদ দিতে হয়। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে জনগণকে নিরুৎসাহিত করতে সময়ে সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এবারের বাজেটে ২ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা পোস্টাল সেভিংস কিনতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত করতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়েছিল। ঐ সুদহারই এখন পর্যন্ত বহাল আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি ‘নিরাপদ’ মনে করছেন। তাই বিভিন্ন শর্ত পরিপালন করেও সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ করে থাকে সরকার। তবে সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেয় সরকার। প্রতি মাসের বিক্রি থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর নিট ঋণ হিসাব হয়। এই অর্থ সরকার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।
সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এই খাতের বিনিয়োগে একের পর এক কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের কড়াকড়ির পরেও কেন বিক্রি বাড়ছে—এ বিষয়ে ব্যাংকাররা বলেছেন, করনীতি কড়াকড়ি আরোপের পরও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অনেক বাড়ছে।
আগের অর্থবছর পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার বেশি অর্থের সঞ্চয়পত্র কিনতে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। চলতি অর্থবছর থেকে এই সীমা বাড়ানো হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে ২ লাখ টাকার কম অর্থের সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন সার্টিফিকেট লাগছে না।
সাধারণত বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার দুই উৎসের আশ্রয় নিয়ে থাকে। বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ উৎস। চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে বৈদেশিক উৎসের প্রতি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে এবার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নেবে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। আর জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেবে ৩২ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নেওয়া হবে ৫ হাজার ১ কোটি টাকা।
বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ পাওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, সেটাও এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের।
তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় তা সংশোধন করে ৩০ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে সেটিকে আরো বাড়িয়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মের পর থেকে এই হার কার্যকর রয়েছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।
খখ/মো মি


