খাসখবর বিনোদন ডেস্ক➤একে একে নিভে যাচ্ছে সংগীতের তারারা। গত ১০ দিনের ব্যবধানে পতন ঘটলো ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতের তিন নক্ষত্রের। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে মারা গেলেন ভারতীয় উপমহাদেশের তুমুল জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী। ৬৯ বছর বয়সে
মুম্বাইয়ের হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এ উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় পর বাপ্পী লাহিড়ীও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
বাপ্পী লাহিড়ী মানেই কি শুধুই ডিস্কো কিং আর ঝলমলে গয়না। না, তার জীবন যেমন রঙিন, সাথে রয়েছে সংগ্রামও। তিন বছর বয়সেই তবলা শেখা। ইচ্ছে ছিল মুম্বইয়ে পাড়ি দেওয়ার। তারপর কী হল?
বাপ্পী লাহিড়ীর আসল নাম অলোকেশ লাহিড়ী। জন্ম ২৭ নভেম্বর, ১৯৫২ সালে। জলপাইগুড়ি জেলায়। ডাক নাম ছিল বাপ্পী। রেখেছিলেন এক আত্মীয়া। কে জানত, একদিন এই নামেই বিশ্ব কাঁপাবেন তিনি। বাড়িতে সঙ্গীতের চর্চা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা অপরেশ লাহিড়ী আর মা বাঁশুড়ি লাহিড়ী দুজনেই বাংলা সঙ্গীত জগতে ছিলেন পরিচিত নাম। গানের হাতেখড়ি পরিবারেই।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে মুম্বই পাড়ি দেন গায়ক। ইচ্ছে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া, চোখে সোনালি স্বপ্ন। ১৯৭৩ সালে হিন্দী ভাষায় নির্মিত নানহা শিকারী ছবিতে তিনি প্রথম গান রচনা করেন তিনি। এরপর তাহির হুসেনের জখমী (১৯৭৫) চলচ্চিত্রে কাজ করেন।
মাত্র ১১ বছর বয়সে নাকি প্রথম গানের সুর দিয়েছিলেন তিনি। অসম্ভব দ্রুতগতিতে সব কিছু ধরে নেওয়ার ক্ষমতা তার। বাংলা ছবি দাদুতে ১৯৭২ সালে সুর দেন। কিন্তু মন টেঁকেনি শহরে। মায়ানগরীর হাতছানি দিচ্ছিল তাঁকে। ছেলের কারণে, বাবা-মাও শিফট হয়ে গিয়েছিলেন বম্বেতে।
১৯৭৪ সাল। সে সময় রাহুল দেব বর্মণ ভীষণ ব্যস্ত। তার ডেট পাওয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রযোজকদের কাছে। প্রযোজক হুসেনের ছবি মদহোসে গানের সুর দিলেন আর ডি বর্মণ। কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করার সময় ছিল না তার কাছে। অফার যায় বাপ্পী লাহিড়ীর কাছে। তিনি তখন একেবারে আনকোরা।
বাপ্পীর রাজি ছিলেন কিন্তু বাধ সাধেন বাবা অপরেশ লাহিড়ী। প্রযোজক তাহির হুসেনকে তিনি বলেন, আর ডি বর্মনের সুর দেওয়া ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তার ছেলে করতে পারেন তবে এক শর্ত রয়েছে, আর ডি’র কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে হবে সবার আগে। ভবিষ্যতে যাতে এই নিয়ে কোনও কথা না ওঠে সেই কারণেই হয়তো এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
তাই-ই হয়, ১৯৭৫-এ বাপ্পী পেয়ে যান জাখমি ছবির ব্রেক। বাপ্পির হিট হিসেবে প্রথম জাখমিকেই ধরা যেতে পারে। ওই ছবিরও প্রযোজক ছিলেন তাহির হুসেন। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সুনীল দত্ত, আশা পারেখ, রাকেশ রোশন, রীনা রায় সহ অনেকে। পরিচালনায় ছিলেন রাজা ঠাকুর। কিশোর কুমারের হাস্কি গলায় জালতা হ্যায় জিয়া মেরে অথবা লতার গলায় বাপ্পীর সুরে আভি আভি থি দুশমানি… আজও কি ভোলা যায়?
তাকে ডিস্কো কিং বললে ভুল বলা হবে। রোম্যান্টিক গান থেকে শুরু করে ভজন, কাওয়ালি থেকে রাগাশ্রয়ী গান, সবেতেই ছিল তার অনায়াস যাতায়াত। টুটে খিলানে ছবিতে নানহা সা পঞ্চি মেরা — সর্বক্ষেত্রেই ছিল তার অনায়াস যাতায়াত।
১৯৮৬ সালে গিনিশ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নিজের নাম তুলে নিয়েছিলেন। ৩৩টি ছবির জন্য ১৮০টি গান রেকর্ড করে। তিনিই একমাত্র ভারতীয় মিউজিক ডিরেক্টর যিনি জোনাথন রসের লাইভ পারফরম্যান্সে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে। তার আইকনিক গান জিমি জিমি আজা আজা… হলিউড ছবি ‘ You Don’t Mess With The Zohan’s’-এ ব্যবহার করা হয়েছিল।
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী কোটি কোটি ভক্ত, অনুরাগীর সঙ্গে রেখে গেছেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ। আর তিনি ‘গোল্ড লাভার’ ছিলেন। তাই তার সংগ্রহে ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা।
২০১৪ সালে ভারতে শ্রীরামপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। নির্বাচন কমিশনকে হলফনামায় তিনি জানিয়েছিলেন, ৭৫৪ গ্রাম সোনা এবং ৪ দশমিক ৬২ কেজি রুপার গয়না রয়েছে তার কাছে।
২০১৪ সালে তিনি জানিয়েছিলেন, তার সোনার গয়নার বাজারমূল্য ৪০ লাখ টাকা। তার রুপার গয়নার বাজারমূল্য ছিল দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। মোট ২০ কোটি টাকার সম্পত্তি ছিল তার। তবে আট বছরে যে তার গয়না ও সম্পদের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল, তা বলা বাহুল্য।
তবে সোনার পাশাপাশি গাড়ি কেনার শখও ছিল তার। নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী, পাঁচটি গাড়ি কিনেছিলেন তিনি। একটি ৪২ লাখ টাকার বিএমডব্লিউ গাড়ি ছিল তার। ৩২ লাখ টাকার একটি অডি গাড়ি ছিল। এ ছাড়াও ২০ লাখ টাকার ফিয়াট, ১৬ লাখের সোনাটা এবং আট লাখ টাকার স্করপিও ছিল তার। শোনা যায়, ৫৫ লাখ টাকার একটি টেসলা এক্স গাড়িও ছিল তার।
কার নলেজে-২০২১ এর তথ্য অনুযায়ী, বাপ্পি লাহিড়ির মাসিক আয় ২০ লাখ টাকা এবং বাৎসরিক আয় ২ কোটি টাকারও বেশি ছিল৷ তিনি মহারাষ্ট্রের মুম্বাইতে ২০০১ সালে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বাড়ি কেনেন।
বাপ্পি লাহিড়ী সিনেমার গান করার পাশাপাশি একাধিক রিয়েলিটি শো-র বিচারক ছিলেন। সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, প্রতিটি গানের জন্য আট থেকে ১০ লাখ টাকা নিতেন তিনি। এক ঘণ্টার পারফরম্যান্সের জন্য ২০-২৫ লাখ টাকা নিতেন। ভারতের সর্বাধিক করদাতাও ছিলেন তিনি।
১৯৭০ থেকে ৮০-এর দশকে হিন্দি ছায়াছবির জগতে অন্যতম জনপ্রিয় নাম বাপ্পি লাহিড়ী। হিন্দিতে ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘চলতে চলতে’, ‘শরাবি’, বাংলায় অমর সঙ্গী, আশা ও ভালোবাসা, আমার তুমি, অমর প্রেম প্রভৃতি ছবিতে সুর দিয়েছেন। গেয়েছেন একাধিক গান। ২০২০ সালে তার শেষ গান ‘বাগি-৩’ এর জন্য। কিশোর কুমার ছিলেন বাপ্পির সম্পর্কে মামা। বাবা অপরেশ লাহিড়ি ও মা বাঁশরী লাহিড়ি দু’জনেই সংগীত জগতের মানুষ। ফলে একমাত্র সন্তান বাপ্পি ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। মা-বাবার কাছেই পান প্রথম গানের তালিম।
তারপর দীর্ঘদিন বাংলা ও হিন্দি ছবির গান গেয়েছেন, সুর দিয়েছেন। প্রচুর সোনার গয়না পরতে ভালোবাসতেন। ছিল গায়কির নিজস্ব কায়দা, যা তাকে হিন্দি ছবির জগতে অনন্য পরিচিতি দিয়েছিল।
খখ/মো মি


