খাসখবর চট্টগ্রাম ডেস্কঃ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উপলক্ষে চট্টগ্রামে লাখো মানুষের সমাগম ঘটেছে। নানা শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর নেচে গেয়ে বর্ণাঢ্য
শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে দুই বছর বন্ধ থাকার পর এবার আবারও রথযাত্রার আয়োজন করা হয়। লোক সমাগম ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি।
তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এবারের রথযাত্রা পেয়েছে ভিন্ন রূপ।
শ্রীজগন্নাথ দেব, বোন সুভদ্রা রাণী ও ভাই বলরাম এসেছেন জনারণ্যে, তাঁদের দর্শনে ভক্ত-দর্শনার্থীরাও নেমেছিলেন পথে। টেনেছেন রথের রশি।
শুক্রবার (১ জুলাই) বিকেলে নগরীর প্রবর্তক মোড় থেকে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের আয়োজনে রথযাত্রা উপলক্ষে শোভাযাত্রা বের হয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ রথযাত্রার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবগুলো বাঙালি সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। রথযাত্রাও বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি নয় মাস যুদ্ধ করে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান থেকে বের হয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন করেছিল। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। হিন্দুদের জন্য একটি রাষ্ট্র ও মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র।’ বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের মূল চরিত্র ফিরিয়ে আনার কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌরদাস ব্রহ্মচারীর সভাপতিত্বে ও রথযাত্রা উদযাপন কমিটির মিডিয়া সমন্বয়ক বিপ্লব পার্থের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- ইসকন বিভাগীয় কমিটির সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণদাস ব্রহ্মচারী, ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণমন্দির পরিচালনা কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাই কমিশনার ডা. রাজীব রঞ্জন, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান, চসিক কাউন্সিলর পুলক খাস্তগীর, নীলুনাগ ও রুমকি সেনগুপ্ত, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা কমিটির সভাপতি আশীষ ভট্টাচার্য্য ও সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল সেন উজ্জ্বল।
এছাড়া বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বক্তব্য দেন। সংবর্ধিত অতিথি ছিলেন ডা. বিনয় পাল। এসময় অতিথিদের কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। অতিথিরা তপোবন রথযাত্রা সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।
চট্টগ্রামে রথযাত্রায় লাখো মানুষের সমাগমের এশোভাযাত্রা প্রবর্তক থেকে শুরু হয়ে মেহেদীবাগ, আলমাস মোড়, কাজির দেউড়ি, জামালখান, চেরাগি পাহাড় হয়ে নন্দনকাননে গিয়ে শেষ হয়।
অন্যদিকে একইসময়ে কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উৎসব উদযাপন কমিটির উদ্যোগে শুক্রবার বিকেলে নগরীর নন্দনকানন তুলসীধাম মন্দির থেকে আরেকটি শোভাযাত্রা বের হয়।
এই শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সহকারী হাই কমিশনার ডা. রাজীব রঞ্জন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে রাজীব রঞ্জন বলেন, ‘রথযাত্রায় মানুষের মিলনমেলা দেখে আমি অভিভূত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের আত্মার সম্পর্ক। ভূতাত্ত্বিক সীমানা আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হবে না। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে।’
শ্রীমৎ কালীপদ ভট্টাচার্য্য বলেন, শ্রীজগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলভদ্র দেবের আশীর্বাদে জীবন হয় সুন্দর। সমস্যায় ঘেরা জীবনে মুক্তি দেন ত্রি-দেবতা। জীবন রথ পরিচালিত করতে এই রথযাত্রা দেয় অনুপম শিক্ষা।
কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি রঞ্জন প্রসাদ দাশগুপ্তের সভাপতিত্বে ও অনুপম দেবনাথের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন- তুলসীধামের মোহন্ত দেবদীপ পুরী, সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর, কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামদাশ ধর, চমেক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিনয় পাল, অধ্যাপক প্রণব মিত্র চৌধুরী, চসিক কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী, শৈবাল দাশ সুমন, পুলক খাস্তগীর ও রুমকি সেনগুপ্ত, তুলসীধাম পরিচালনা পরিষদের সভাপতি স্বপন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক প্রণত মিত্র চৌধুরী।
চট্টগ্রামে রথযাত্রায় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লাখো মানুষ শোভাযাত্রায় অংশ নেন। হাতির পিঠে চড়ে, ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে, ট্রাক- কাভার্ড ভ্যানে দেবদেবীর মূর্তি নিয়ে ও বাদ্যবাজনা বাজিয়ে লোকজন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
হাজার হাজার মানুষ সড়কের দুইপাশে দাঁড়িয়ে রথযাত্রার রশি টেনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। নারীরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলশাঁখ বাজিয়ে রথযাত্রাকে অভ্যর্থনা জানান। শোভাযাত্রায় পৌরাণিক সাজের মাধ্যমে আবহমান বাংলার ও বৈদিক সংস্কৃতির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়।
শ্রীশ্রী মদনমোহন নরসিংহ গোপাল জীও’র মন্দির থেকে ঢোলক বাদ্য, মঙ্গল শঙ্খ ও উলুধ্বনি দিয়ে শ্রীজগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলভদ্র দেবকে রথারোহণ করানো হয়। পরে বেলুন উড়িয়ে ও রথের রশি টেনে রথপরিক্রমা শুরু করেন তুলসীধামের মোহন্ত এবং অতিথিরা। কেন্দ্রীয় রথের সাথে মহাশোভাযাত্রা সহকারে হাজারী লেইন শ্রীকৃষ্ণায়ন রথ, পাথরঘাটা জগন্নাথ মন্দিরের রথ, গঙ্গাবাড়ির রথ, গৌর গিরিধারী মন্দিরের রথ, সদরঘাট পার্বতী ফকির পাড়ার রথ, মাইজপাড়ার রথ, ফিরিঙ্গীবাজার শাহাজীপাড়ার রথ, টেকপাড়ার রথ, এনায়েত বাজার কেদারনাথ তেওয়ারী কলোনির রথ, টাইগারপাস জগন্নাথ সংঘের রথ, পুরাতন কাস্টমস এলাকার রথ, ইপিজেড শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের রথসহ বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের রথসমূহ পরিক্রমায় অংশ নেয়।
শোভাযাত্রায় অদ্বৈত-অচ্যুত মিশনের ভক্ত, জন্মাষ্টমী ছাত্র পরিষদ, বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় সংগঠনের ভক্তরা যোগ দেন। সিএমপির রোডম্যাপ অনুযায়ী এসব রথ নিউমার্কেট থেকে লালদীঘির মোড় ঘুরে আন্দরকিল্লা এলাকায় আসে। সেখান থেকে চেরাগী পাহাড় হয়ে প্রেসক্লাব ঘুরে লাভলেইন সড়ক দিয়ে পুনরায় নন্দনকানন রথের পুকুর পাড় এসে শেষ হয় পরিক্রমা।
এদিকে তুলসীধামে রথযাত্রা উপলক্ষে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় নামযজ্ঞ, মদনমোহন পূজা, জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলভদ্রের পূজা, বিতরণ করা হয় মহাপ্রসাদ।
এছাড়া ইসকন নন্দনকানন শ্রীশ্রী রাধামাধব মন্দির ও গৌরনিতাই আশ্রমের আয়োজনে ডিসি হিলে ২৫তম (রজতজয়ন্তী) রথযাত্রা মহোৎসব আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় ছিল মঙ্গলারতি, গুরুপূজা, শ্রীম্দ্ভাগবত পাঠ, জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা মহারাণীর রাজবেশ দর্শন, বিশ্বশান্তি কামনায় হোম যজ্ঞ, রাজভোগ নিবেদন, কীর্তনমেলা, ধর্ম মহাসম্মেলন। উপস্থিত ছিলেন মায়াপুরের অমিয় বিলাস স্বামী মহারাজ, গদাধর গোস্বামী মহারাজ। ডিসি হিল প্রাঙ্গণ থেকে মুকুন্দ ভক্তি দাস ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে শুরু হয় রথ পরিক্রমা ও শোভাযাত্রা, যা চেরাগী পাহাড় থেকে আন্দরকিল্লা হয়ে নিউমার্কেট-বোস ব্রাদার্স মোড় এলাকা প্রদক্ষিণ করে।
এছাড়া চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে অধিকাংশ থানা এলাকার মন্দির কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চট্টগ্রামে ১৮শ খৃষ্টাব্দের পর রথযাত্রা উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। শহরের নন্দনকাননে রথের পুকুর পাড় এলাকায় আষাঢ়ের রথদ্বিতীয়া তিথিতে বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের রথ ছাড়াও আশপাশের উপজেলা থেকে রথগুলো এসে জমা হতো, বসতো মেলা। পুকুরে পুণ্যস্নান করতেন ভক্তরা। সবগুলো রথ পুকুর পাড়ে রাখা হতো বলে স্থানটিও সেই নামে (রথের পুকুর) পরিচিতি পায়।
আগামী ৮ জুলাই উল্টো রথযাত্রার মধ্য দিয়ে এ উৎসবের সমাপ্তি হবে।
খখ/মো মি


