খাসখবর নির্বাচন ডেস্ক: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তফসিল ঘোষণার পর সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে প্রশাসন ও পুলিশে রদবদলের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন।
একই সঙ্গে তফসিলের পরপরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী হাকিমদের তৎপরতা বাড়াতে বলেছে কমিশন।
পাশাপাশি শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেওয়া হয়েছে সংসদ নির্বাচনের প্রাক প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়।
বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এ সভায় ভোটের সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাজ তুলে ধরে যথাসময়ে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের ৩১ জন শীর্ষ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বিকাল ৩টা থেকে নির্বাচন ভবনে এ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সভার সার্বিক বিষয়ে আলোচনা ও ইসির নির্দেশনার বিষয়ে সন্ধ্যা ৬টায় ব্রিফিং করেন ইসির সচিব আখতার আহমেদ।
জাতীয় নির্বাচনের প্রাক প্রস্তুতির এ সভায় গণভোট নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, গণভোটের সিদ্ধান্তটা দেবে সরকার।
ইসি সচিব বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে, তাদের সচিব, মহাপরিচালক অন্যান্য সংস্থা প্রধানদের নিয়ে এ বৈঠক হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিভিন্ন বিষয় তাদের নজরে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেন নির্বাহী হাকিমরা কাজ করা শুরু করেন, … পূর্ণমাত্রায় তারা (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) প্রথম থেকে কাজটা করাতে পারেন। যাতে নির্বাচন আচরণ বিধি প্রতিপালন নিয়ে ইসিকে যেন বাড়তি চিন্তার মধ্যে পড়তে না হয়।
তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ইসির নিয়ন্ত্রণে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বৈঠকে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ইসি বলেছে, এখন পুলিশ ও প্রশাসনে রদবদল হবে, পরবর্তীতে যখন নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করবে, তখন আমরা নির্বাচন কমিশন থেকেও তাদের সেভাবে জানাবো।
বৈঠকে তফসিলের পর কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তরের কাজ কী, কখন বাস্তবায়ন করবে, কীভাবে করবে-তা সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
রোজার আগে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্থে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এজন্য ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি।
ভোটকেন্দ্র স্থাপন:
ইসি সচিব বলেন, ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনাগুলোর অবকাঠামো সংস্কার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ, প্রকৌশল অধিদপ্তরের নজরে আনা হয়েছে।
অবকাঠামো সংস্কার, মেরামত, সীমানা প্রাচীর, দরজা জানালা ঠিক করার বিষয়গুলো ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ ঠিক করার জন্য বলেছে ইসি।
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্যানেল:
বৈঠক শেষে জানানো হয়, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল ও নির্বাচনের দায়িত্বের জন্য বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এবং সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদেরও এবার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুযায়ী প্রিজাইডিং, সহকারি প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারের জন্য বেশি সংখ্যক প্রস্তুত রাখা হবে।
ইসি সচিব বলেন, ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্র ও আনুপাতিক হারে ভোটকক্ষের জন্য এসব কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করা হবে।
পার্বত্য এলাকায় সরঞ্জাম ও কর্মকর্তাদের আনা-নেওয়া:
বৈঠকের বিষয়ে সচিব বলেন, তিন পার্বত্য দুর্গম এলাকায় নির্বাচনি সরঞ্জাম হেলিকপ্টারে করে পরিবহন করবে বিমান বাহিনী। এজন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলায় হেলিপ্যাডটা তৈরি করতে বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি দেখবে।
সচেতনতা:
ভোটের বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা, জনসচেতনতা ও সচেতনতা উদ্বুদ্ধকরণে তথ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারের পাশাপাশি সংসদ টেলিভিশন, বিটিভি নিউজ চ্যানেলে প্রচারণা চালানো হবে। এজন্য সহযোগিতা করবে বিটিভি।
পর্যবেক্ষক:
দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে এ বৈঠকে।
ইসি সচিব আখতার বলেন, “বিদেশি পর্যবেক্ষকরা যখন আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আসেন তাদের সহযোগিতা করা হবে। স্বউদ্যোগী হয়ে অনেকে আসেন, ইসিও অনেককে আসার অনুরোধ করেন। তাদের ভিসা পাওয়া যেন সময়ক্ষেপণ না হয় এবং তারা যেন যথাযথভাবে ভিসা পেতে পারেন সে বিষয়টা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে।”
ঋণখেলাপির তথ্য:
প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত তথ্য যথাসময়ে সরবরাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বৈঠক শেষে ইসি সচিব বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বৈঠকে জানিয়েছেন- তাদেরকে একটু সময় দিতে হবে। তাদের চার থেকে পাঁচ দিন সময় দিলে ভালোভাবে এসব তথ্য দেওয়া যায়।“
সাশ্রয়ী বাজেট:
জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় আইনশৃঙ্খলা খাতে। সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যয় হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এবার এর চেয়ে বেশি বরাদ্দ হচ্ছে। সবগুলো মন্ত্রণালয় বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরেছে এ সভায়।
ইসি সচিব বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই অল রোডস লিড টু ফাইন্যান্স। বাজেটের ব্যাপারে সবাই কথা বলেছেন।
“তবে আমরা বলেছি যে বাজেটের ব্যাপারে সাশ্রয়ী হতে হবে। যেন বেশি খরচ না হয় প্রয়োজনীয় খরচ হবে যেন সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাজেট চাওয়া হয়।”
জনবল, যানবাহ ও অন্যান্য সহায়তা:
বৈঠক শেষে ইসি সচিব বলেন, ভোটের কাজে যানবহন, জনবল, লজিস্টিক সহায়তাসহ মাঠ পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দের ব্যাপারটাও এসেছে আলোচনায়। যানবাহন ‘রিকুইজিশন’ করতে হয়; বিশেষ করে সরকারি সংস্থার কাছ থেকে যানবাহনের সহযোগিতার বিষয়ে নজর দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা:
ভোটের পরিবেশ ও শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্বাহী হাকিম নিয়োগের ব্যাপারে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আবারও আনা হয়েছে সভায়।
ইসি সচিব বলেন, সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। সবাই বলেছেন-তফসিল ঘোষণার পর থেকে যখন ‘এক্সিকিউটিভরা’ কাজ করা শুরু করেন, তখন তাদের সংখ্যা কম থাকে এবং তাদের চলাচলের জন্য কিছু অসুবিধা হয়।
“কিন্তু আমরা এটা বলেছি যে, পূর্ণমাত্রায় তারা (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) প্রথম থেকে কাজটা করাতে পারেন। যাতে নির্বাচন আচরণ বিধি প্রতিপালন নিয়ে ইসিকে যেন বাড়তি চিন্তার মধ্যে পড়তে না হয়।”
পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারিক হাকিমদের নিয়েও যেন ‘ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে তুলে ধরেন ইসি সচিব।
তিনি বলেন, “আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ওইভাবে কমিটি করে দেবেন। ইনকোয়ারি কমিটির জন্য পর্যাপ্ত লোক দিলে আমরা করে নেব।”
ভোটের সময় পরীক্ষাসূচি নয়:
ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষা সূচির বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
আখতার আহমেদ বলেন, “বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে আমরা বলেছি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন। সাধারণত ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা থাকে না, তারপরে রোজা। কাজেই এ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে যেন, পাবলিক পরীক্ষার (সূচির সাথে ভোটের সময়ের) সাথে কনফ্লিক্ট না করে নির্বাচনকে।”
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ:
ভোটের সময় নির্বাচনি অফিস, ভোটকেন্দ্রেসহ প্রয়োজনীয় সব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবাহে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখার পাশাপাশি সচিব বলেন, ভোটের সময় দায়িত্বে নিয়োজিতদের জন্য প্রয়োজন হলে সহায়তা লাগবে। এ জন্য মেডিকেল টিম গঠন করার বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে বলা হয়েছে।
ভোটের নির্ধারিত সময়ে সড়ক ও নৌপথে যান চলাচল সীমিত করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। এজন্য প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট, এআইয়ের অপব্যবহার রোধ:
ইসি সচিব বলেন, এবারের নির্বাচনে নতুন সংযোজন হয়েছে পোস্টাল ভোটিং। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী এবং দেশে যারা আছেন (নির্বাচনি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত, সরকারি চাকরিজীবি ও কারা হেফাজতে থাকা ব্যক্তি) তাদের ভোটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
নিবন্ধন অ্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে ১৬ নভেম্বর।
এদিকে এআই এর অপব্যবহার রোধে ও মিথ্য তথ্য, অপতথ্য, গুজব রোধে ইসির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনেও একটা সমন্বয় সেল গঠন করা হবে।
“যাতে ভুল তথ্য, ভুল প্রচারণের মাধ্যমে মানুষকে যেন বিভ্রান্ত না করা হয়; সঠিক তথ্য প্রবাহটা যেন নিশ্চিত করা হয় সে উদ্যোগ থাকছে” বলেন সচিব আখতার আহমেদ।
প্রশাসন-পুলিশে রদবদল:
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষাসহ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে, নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে ইসি সচিব বলেন, “এট রুটিন ম্যাটার। এটা রেগুলার পদ্ধতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা করছে।”
তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে রদবদল হবে। মাঠ প্রশাসনের যে সমস্ত রদবদল হবে সেটা প্রাথমিকভাবে এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারা নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করছেন।
“পরবর্তীতে যখন নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করবে, তখন আমরা নির্বাচন কমিশন থেকেও তাদের সেভাবে জানাব।”
খখ/মো মি


