খাসখবর প্রতিবেদক, বিভাগীয় ডেস্ক: অবশেষে কুমিল্লা জেলা পুলিশের আলোচিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামীম কুদ্দুস ভূঁইয়াকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে এ প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এতে সই করেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি বছরের ২০ আগস্ট কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামীম কুদ্দুস ভূঁইয়াকে দিনাজপুর ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হলেও তিনি বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ দেননি এবং নিয়মিত অফিসে গরহাজির থাকছেন। কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়া সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুসারে অসদাচরণের শামিল।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুসারে অসদাচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় ২০ আগস্ট থেকে সরকারি চাকরি থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
এতে আরও বলা হয়, সাময়িক বরখাস্তকালীন শামীম কুদ্দুস ভূঁইয়া বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা পাবেন।
উল্লেখ্য, গত ২৩ অক্টোবর জাতীয় নিউজ পোর্টাল ‘খাসখবর ডট নিউজ’ এ “কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার খুঁটির জোর কোথায়? ‘পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে স্ট্যান্ড রিলিজের পরেও স্বপদে বহাল!’ শিরোনামে স্ববিস্তারে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয় এবং দেড় মাসের মাথায় কুমিল্লার আলোচিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়াকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের আগস্ট মাসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও তিনি এই অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেছিলেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর মাস দুয়েক আগে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি অফিস থেকে একটি টিম কুমিল্লায় পাঠানো হয় এবিষয়ে তদন্ত করতে। তদন্ত টিমের নেতৃত্বে ছিলেন পুলিশ সুুপার (এসপি) পদ-মর্যাদার এক কর্মকর্তা।
এবিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন কুমিল্লা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি অধ্যক্ষ কবির আহমেদ। তিনি বলেছিলেন, কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উঠা পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করতে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি অফিস থেকে একটি টিম কুমিল্লায় আসেন। তারা আমাদের সাথে বসেছিলেন এবিষয়ে জানতে।
তিনি আরও বলেন, পরিবহন সেক্টরের ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতায় এই প্রথম কোন পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুনলাম।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়া এর আগের কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় নির্বাচনী কাজে এক প্রার্থীর সাথে মুঠোফোনে পাশ করিয়ে দেয়ার নামে লাখ টাকা দাবি করার ভিডিও ভাইরাল হয়। যাতে তিনি সরাসরি জড়িত। তবে এতো অপকর্ম থাকার পরও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নাই।
অটোরিকশার নগরীতে পরিণত হয়েছে কুমিল্লা। পাঁচ হাজার ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত তিন চাকার যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো শহর । এছাড়া কুমিল্লা নগরীতে আছে তিনটি বাসস্ট্যান্ড। যত বেশি গাড়ি ও অটোরিকশা রাস্তায় চলে, তত বেশি ইনকাম কুমিল্লার ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার।
জুলাই বিপ্লবের পর কিছুদিন নগরীতে চাঁদাবাজি বন্ধ থাকলেও কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। চাঁদাবাজির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের সারিতে নাম লিখিয়েছেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিমের চাঁদাবাজির একটি অডিও রেকর্ড সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। এতে শোনা যায়, এখন থেকে বাসস্ট্যান্ডের কোনো টাকা সার্জেন্ট বা টিআইকে দেবেন না। আমার লোক আসবে তার কাছে দেবেন। অডিওতে ভুক্তভোগীকে বলতে শোনা যায়, একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সরাসরি টাকার জন্য আসে জীবনে প্রথম দেখলাম। সব কাউন্টার থেকেই সরাসরি গিয়ে চাঁদা চেয়েছেন তিনি। সরাসরি পুলিশের পোশাকেই এসেছিলেন শামিম। অডিওতে বলতে শোনা যায়, এক বাস মালিক বলছেন ৩৮ বছর বয়সে এই প্রথম দেখলাম কোনো অতিরিক্ত এসপিকে সরাসরি এসে টাকা চাইতে।
কুমিল্লায় তিনটি জোন আছে । লাকসাম জোন ২০ হাজার, দাউদকান্দি ও দেবীদ্বার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে আদায় করেন শামিম। এছাড়া কুমিল্লায় পাঁচ হাজার অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিটি থেকে মাসে ৫০০ টাকা আদায় করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের অনেক তথ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে ফাঁস করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিম । এমন একটি ঘটনার প্রমাণও পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে। ডিএসবিতে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পর তাকে ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে বদলি করা হয়।
কুমিল্লা নগরীতে সার্জেন্ট ও টিএসআই আছেন ১১ জন। আর পুরো জেলায় আছেন ১৭ জন । ট্রাফিক সদস্য আছে ৮৯ জন। প্রতি সার্জেন্টকে মাসে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শামিম। বিষয়টি নিয়ে সার্জেন্টদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও তারা কিছুই বলতে পারছেন না।
চাকরি হারানোর ভয়ে নাম প্রকাশ না করে এক সার্জেন্ট গণমাধ্যমকে বলেন, একটি বৈঠকে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম আমাদের বলেন, আমি ২০টি পরিবহনের নাম দেব । এগুলোর প্রত্যেকটি থেকে একটি করে গাড়ি ডাম্পিং করে রাখবেন। প্রতি গাড়ি মাসে ৫০০ টাকা করে দেবে। আমি কি এখানে হজ করতে এসেছি, আমারও তো সংসার আছে।
হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিক বলেন, একদিন পুলিশের পোশাকে শামিম জাঙ্গালিয়া বাসস্ট্যান্ডে আসেন । গাড়ি থেকে নেমেই বলেন, ‘যোগাযোগ আমার সঙ্গে করবা, আমি ট্রাফিক ইনচার্জ।’
সার্জেন্টদের কাছ থেকে মাসে ২০ হাজার, কুমিল্লার তিনটি জোন থেকে মাসে ৫০ হাজার করে তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা শামিম গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, টিআই ও সার্জেন্টরা এগুলো করেন । আমার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে । এগুলো সব মিথ্যা।
জানা গেছে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, হয়রানি হতে রক্ষা পেতে যে কোনো সময় তারা অটো, সিএনজি, বাস বন্ধ করে ডিসি-এসপি অফিস ঘেরাও কর্মসূচীর প্রস্ততি নিচ্ছিল। এতে সারাদেশে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা ছিল।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামিম কুদ্দুছ ভূঁইয়ার এমন কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ হারাচ্ছিল আস্থা, নষ্ট হচ্ছিল পুলিশের ভাবমূর্তি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ায় কুমিল্লার পরিবহন সেক্টর থেকে শুরু করে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস খেলছেন।
খখ/মো মি


