খাসখবর প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ডেস্ক: চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া থানাধীন নতুন ব্রিজ এলাকায় চেকপোস্টে প্রায় এক লাখ পিস ইয়াবা জব্দের পর আত্মসাতের অভিযোগে ২ জন এসআই, ৪ জন এএসআই ও ২ জন কনস্টেবলসহ আট পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ বরখাস্তের নোটিশ এবং এ আদেশ দিয়েছেন।
বরখাস্ত হওয়া আট পুলিশ সদস্য হলেন— সিএমপি দক্ষিণ জোনের বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার; সাবেক বাকলিয়া থানা ও বর্তমানে কোতোয়ালী থানায় কর্মরত এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন; বাকলিয়া থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম ও এএসআই মো. জিয়াউর রহমান; সাবেক বলিরহাট পুলিশ ফাঁড়ি ও বর্তমানে কোতোয়ালী থানায় কর্মরত এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন; বাকলিয়া থানার এএসআই এনামুল হক; কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা এবং বাকলিয়া থানার নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।
জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে তল্লাশিকালে উদ্ধার হওয়া ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় প্রাপ্ত মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্য করার অভিযোগে এসআই, এএসআইসহ নারী ও পুরুষ কনস্টেবল মিলিয়ে মোট আটজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
গতকাল ৪ জানুয়ারি বিকেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দক্ষিণ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ও সদ্য অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভুঁইয়ার স্বাক্ষরিত দুই পৃষ্ঠার একটি অফিস আদেশে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, পিআরবি বিধি-৮৮০ অনুযায়ী অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের পুলিশ বিভাগের সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আরআই (আরআই), দামপাড়া পুলিশ লাইনস, সিএমপি চট্টগ্রামে রিপোর্ট করে সার্বক্ষণিক হাজির থাকতে ও নিয়মিত রোলকল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তারা বিএসআর পার্ট-১ এর বিধি-৭১ অনুযায়ী খোরপোষ ভাতাসহ প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
সিএমপি দক্ষিণ বিভাগের ২২ নম্বর আদেশের অনুলিপি ও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ বিভাগ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ অনুসন্ধানে সাবেক সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের বাকলিয়া থানা এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা থেকে প্রেরিত প্রতিবেদনে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও আত্মসাতের ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়।

অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৮ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-১৬৪২) নতুনব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাশির সময় কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ থেকে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধারকৃত ইয়াবা যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেন এবং রাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে ইয়াবার চালান বহনে সম্মত হয়েছিলেন। তিনি কোনো ছুটি না নিয়ে ইয়াবা ভর্তি লাগেজসহ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইয়াবা উদ্ধারের পর কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন ‘সেফ এক্সিট’ চেয়ে পুলিশ সদস্যদের কাছে অনুনয় করেন। এরপর ইয়াবার একাধিক কাট ট্রলি থেকে বের করে নেওয়া হলেও পুরো চালান পুলিশের হেফাজতে রেখে কেবল কাপড়চোপড়সহ ব্যাগটি ফেরত দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। তবে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি, বাসের সুপারভাইজারের বক্তব্য এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের জবানবন্দিতে পুরো ঘটনা প্রমাণিত হয়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যরা সকল অবৈধ ও অন্যায় কর্মকাণ্ডে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যাচারসহ বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেছেন। প্রতিবেদনে এই সকল অপরাধের জন্য বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের বাকলিয়া থানা ও তার ফাঁড়িতে কর্মরত নিম্নলিখিত পুলিশ সদস্যরা সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা, বিভাগীয় নিয়ম-শৃঙ্খলা লঙ্ঘন, মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযানে প্রাপ্ত ইয়াবা আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তকরণ এবং বৈধ আদেশ অমান্য করার অভিযোগে পিআরবি বিধি-৮৮০ অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত: এবিষয়টি নিয়ে গত ২২ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে ‘ইয়াবা পাচারে বিচারকের গানম্যান, ধরেও ছেড়ে দিল পুলিশ’ শিরোনামে একটি নিউজ প্রকাশিত হয়। গত ২৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আলাউদ্দিন মাহমুদের নজরে আসে প্রতিবেদনটি। এরপর প্রকাশিত নিউজটি সরাসরি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। আগামী ১২ জানুয়ারি এ অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনারকে (ডিসি) নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।
মামলাটি রেকর্ড এবং বিচারকের স্বপ্রণোদিত আদেশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম আদালতের নাজির আবুল কালাম আজাদ।
আদেশে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম নগরের প্রবেশমুখ নতুন ব্রিজ এলাকায় বাকলিয়া থানার চেকপোস্টে তল্লাশির সময় ১ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ইমতিয়াজ হোসেন নামে এক পুলিশ সদস্যকে আটক করা হয়। ইমতিয়াজ কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ পরিচয় প্রদর্শন করার পর বাকলিয়া থানার কর্মকর্তারা তাকে ছেড়ে দেন এবং উদ্ধারকৃত ইয়াবা জব্দ না করে গায়েব করে ফেলেন।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এরূপ সন্দেহমূলক অনুমান হয় যে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ এর ৪৬ ধারার বিধানমতে মাদকদ্রব্য অপরাধসমূহ আমলযোগ্য অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও উক্ত আইনের অধীন সংঘটিত আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগকে কোনো ব্যক্তিকে মাদকসহ আটক করার পরও বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের না করে পিআরবি এর ২৪৪ ধারা লঙ্ঘন এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
খখ/মো মি


