খাসখবর স্বাস্থ্য ডেস্ক: ২০০০ সালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতি বছরই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ। ২০২৩ সালে এই রোগ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। চলতি বছরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।
গড়ে প্রতিদিন প্রায় কয়েকশ’ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্ত হলেও অনেকেই বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের তথ্য নথিভুক্ত হয় না।
গত একদিনে মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৪৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ১৬৭ জনের মৃত্যু হলো।
আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৪০ হাজার ৪৬১ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২৪১ জন এবং বাকিরা ঢাকা সিটির বাইরের। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৬১ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৫২ জন।
বাংলাদেশে এক বছরে সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ২০২৩ সালে। সেবার মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার আগে ২০১৯ সালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১১ জন, ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং ২০২০ সালে ১ হাজার ৪০৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রতিটি জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব নির্দেশক ব্রেটো ইনডেক্স ২০-এর ওপরে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০-এর ওপরে ইনডেক্স থাকা মানেই সেখানে ডেঙ্গু বিস্তারের উচ্চ ঝুঁকি। বরিশাল বিভাগ, বিশেষ করে বরগুনা ও বরিশাল জেলা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যে হারে বেড়ে চলেছে তা আর কেবল একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই।
নির্মাণাধীন ভবনে খোলা ড্রাম, বালতি, পানির ট্যাংক কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে দিনের পর দিন জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় সেখানে অনায়াসে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। বহুতল ভবনগুলোর বেজমেন্টে গাড়ির পার্কিং এবং গাড়ি ধোয়ার জায়গায় সৃষ্টি হচ্ছে মশার আদর্শ প্রজনন স্থল। কিছু কিছু এলাকাতে পানির সঙ্কট থাকার কারণে বৃষ্টি বা সাপ্লাইয়ের পানি ড্রাম, বালতি এবং অন্যান্য পাত্রে ধরে রেখে নাগরিকরা সৃষ্টি করছে মশার অনন্য বাসস্থান।
নগরজীবনে প্যাকেটজাত ও ক্যানজাত খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ধরনের জিনিসপত্র যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে যা মশার বংশবিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। টানা বৃষ্টি ও অনিয়ন্ত্রিত পানি নিষ্কাশনের অভাব ডেঙ্গুর বিস্তারকে জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বেজমেন্ট, বারান্দা, আঙিনা, বাথরুম, রান্নাঘর কিংবা আশপাশে যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বাড়ির ছাদ বা আঙিনায় রাখা ফুলের টব, বালতি, কৌটা, পানির ড্রাম কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে বৃষ্টির পানি জমা হতে না দেওয়ার বিষয়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ড. কবিরুল বাশার বলেন, দেশের প্রতিটি ওয়ার্ড-ইউনিয়নে লার্ভা পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ চালু করতে হবে। আবহাওয়া, রোগীর সংখ্যা ও মশার ঘনত্বের তথ্য বিশ্লেষণ করে আগাম পূর্বাভাস ও প্রস্তুতি নেয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা দরকার। জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এই যুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব। নিজ নিজ বাড়ি, এলাকা ও কর্মস্থলে প্রত্যেকে যদি দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, তাহলেই এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব। স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মন্দির ও অফিসে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো জরুরি। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গবেষক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ডেঙ্গুকে একটি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে।
খখ/মো মি


