খাসখবর বিভাগীয় ডেস্ক: গত শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর রাত পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার তিনটি
ইউনিয়নের ১২টি মন্দিরের ১৪টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।এঘটনায় এখনো
পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
গত শনিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে উপজেলার ধনতলা ইউনিয়নের আটটি, পাড়িয়া ইউনিয়নের তিনটি ও চাড়োল ইউনিয়নের একটি মন্দিরের ওই ১৪টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। রোববার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে স্থানীয় লোকজন মন্দিরের প্রতিমাগুলো ভাঙচুরের ঘটনাটি দেখতে পান।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ঠাকুরগাঁও জেলার সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত।
প্রবীর কুমার গুপ্ত জানান, গতকাল দিবাগত রাতের কোনো এক সময়ে ধনতলা ইউনিয়নের সিন্দুরপিণ্ডি এলাকার আটটি, পাড়িয়া ইউনিয়নের কলেজপাড়া এলাকার তিনটি ও চাড়োল ইউনিয়নের সাহবাজপুর নাথপাড়া এলাকার একটি মন্দিরের ওই ১৪টি প্রতিমা ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। বেশির ভাগ প্রতিমাই রাস্তার পাশে স্থাপিত মন্দিরের। সেসব মন্দিরে কালী, সরস্বতী, লক্ষ্মী ও মনসার প্রতিমা ছিল। সেসব প্রতিমার মাথা, হাত, পাসহ বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজ সকালে স্থানীয় লোকজন প্রতিমাগুলো ভাঙা অবস্থায় পেয়ে প্রশাসন ও পুলিশকে খবর দেন। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ধনতলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সমর চ্যাটার্জী বলেন, এই এলাকায় এর আগে এ ধরনের ঘটনার নজির নেই। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মুসলিমদের কোনো বিরোধ নেই। প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় কারা সম্পৃক্ত থাকতে পারে, তার কিছুই আন্দাজ করা যাচ্ছে না।
খবর পেয়ে বেলা একটার দিকে প্রতিমা ভাঙচুরের স্থানগুলো পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান ও ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। পুলিশ এ ঘটনায় কাজ করছে। কোনো গোষ্ঠী এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশে এসব মূর্তি ভাঙচুর করেছে কি না, এসব বিষয় মাথায় নিয়ে ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করছি, শিগগিরই দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যাবে।
জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শান্তি ও সম্প্রীতির জনপদকে যারা অশান্ত করতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের শিগগিরই আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ১৫টি সংগঠনের প্রতিবাদ
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে সম্প্রতি এক রাতে ১৪টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ১৫টি পেশাজীবী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।
সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রচার সম্পাদক মীর মাসরুর জামান রনি।
সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে এক রাতে ১২টি প্রতিমা ধ্বংসের ঘটনা যে সুপরিকল্পিত চক্রান্ত এবং সমাজের সম্প্রীতি নষ্টের জন্য দেশবিরোধী চক্রের কারসাজি তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। আমরা শক্ত হাতে এই অপরাধী চক্রের ঘৃণ্য অপৎপরতা দমনের জোর দাবি জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন কাজ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই যোগ্যতা ও দক্ষতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনও ধরনের ব্যর্থতা ও শৈথিল্য জাতি বরদাশত করবে না। এক ধর্মের উপাসনালয়ে আঘাত সব ধর্মের অবমাননা। আমরা স্থানীয় জনগণসহ দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দ্বারা বাংলাদেশের সম্প্রীতি কলুষিত করার ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পুনরায় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।
বিবৃতিদাতা সংগঠনগুলো হলো, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদ, আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ অভিনয় শিল্পী সংঘ, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলাদেশ শিশু সংগঠন ঐক্যজোট।
বালিয়াডাঙ্গীতে প্রতিমা ভাঙচুরের নিরপেক্ষ তদন্ত চান মির্জা ফখরুল
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাশাপাশি এ গটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের অবিলম্বে খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব এই দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই ঘটনা শুধু ন্যাক্কারজনকই নয়, রহস্যজনক; পূর্ব পরিকল্পিত এবং কলঙ্কজনক। এর নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জল দৃষ্টান্ত।
হিন্দু ধর্মালম্বীদের মন্দির, প্রতিমা ভাঙচুর করে যারা সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চায় তারা নরকের কীট। বালিয়ডাঙ্গির ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, নিরপেক্ষ তদন্ত করে তা খুঁজে বের করতে হবে। আমি অবিলম্বে বালিয়াডাঙ্গীর মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
একই সঙ্গে এ ঘটনায় ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত নিরীহ মানুষকে যেন হয়রানি না করা হয় সেদিকে প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
গত শনিবার রাত থেকে রোববার ভোর রাত পর্যন্ত জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ১৪টি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সমগ্র এলাকায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে, যা সামাজিক সম্প্রীতির অন্তরায়। যেসব মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, তার বেশিরভাগই সড়কের পাশে ছিল। রাতে সাধারণত টহল পুলিশ থাকে। কিন্তু সেখানে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিও রহস্যজনক। তাদের গাফিলতিতে দুর্বৃত্তরা অনায়াসে এত বিপুল সংখ্যক মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাতে পেরেছে বলে সাধারণের ধারণা। সরকার এর দায় এড়াতে পারে না।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশে চলমান দুঃশাসনে এমন এক অস্বাভাবিক ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে অপরাধ করলেও দলীয় বিবেচনায় প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে নতুন নতুন অপরাধ করতেই থাকে। দেশ আজ যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
জনগণ আজ চরম নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডতো বটেই, সামাজিক ও ধর্মীয় কাজও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। এর আগেও মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও হামলা হয়েছে। সরকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠভাবে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে পারেনি।
ফখরুল অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় যখনই হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি-সম্পদ, বাড়ি, ব্যবসা দখল, মন্দির, প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এর আগেও বালিয়াডাঙ্গীতে ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও তার পরিবারের সদস্য এবং তার অনুগত লোকজন শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি দখল নয়, তাদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। তখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে তিনি অবিলম্বে সরকারি খরচে প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ ক্ষতিগ্রস্ত মন্দিরগুলো পুণঃনির্মাণে দাবি জানান।
খখ/মো মি


