হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বড় ৫ চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

Oplus_131072
thai foods

খাসখবর জাতীয় ডেস্ক: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের পাল্টা হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে বড় পাঁচ ধরনের চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

thai foods

সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায়, বিশেষ করে গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একযোগে কয়েকটি বড় চাপ তৈরি হতে পারে গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষিতে সেচ ব্যাহত হওয়া, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা। এসব মিলেই তৈরি হতে পারে এক ধরনের ‘পারফেক্ট ইকোনমিক স্টর্ম’।

বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহ ঘিরে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার চাহিদা মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে।

এই এলএনজির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে। এসব জাহাজের প্রধান নৌপথই হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নতুন এলএনজি কার্গো আসা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো না এলে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে প্রথম ধাক্কা লাগবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাস সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বেড়ে যেতে পারে।

গ্যাস সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে শিল্পখাতে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হলে রপ্তানিনির্ভর শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

গ্যাসের পাশাপাশি অপরিশোধিত তেল সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এই তেলও পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি হয়ে।

সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল টার্মিনাল রাস তানুরা এলাকায় ড্রোন হামলার পর লোডিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, পরিকল্পিত আমদানি সূচি ঠিক থাকলে তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ডিজেল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬২ টন (প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা), অকটেন ৩৬ হাজার ৬৪০ টন (২৮ দিন), পেট্রোল ২১ হাজার ৯২ টন (১৫ দিন), জেট ফুয়েল ৬০ হাজার ২০ টন (৩০ দিন), ফার্নেস অয়েল প্রায় ৯৩ দিনের ও কেরোসিন প্রায় ২৪১ দিনের মজুত রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মজুত স্বল্পমেয়াদি সংকট সামাল দিতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

কৃষি খাত, বোরো মৌসুমে সেচ সংকটের আশঙ্কা: জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে কৃষি খাতে। বর্তমানে দেশে বোরো ধান চাষের মৌসুম চলছে, যেখানে সেচের জন্য বিপুল পরিমাণ ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।

ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পও সমস্যায় পড়বে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া সার পরিবাহিত হয় হরমুজ রুট দিয়ে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সারের দাম বাড়তে পারে।

ডিজেল ও সারের ওপর একযোগে চাপ তৈরি হলে বোরো উৎপাদনে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

বাণিজ্য ও রপ্তানি খাত, বাড়ছে শিপিং ব্যয়: মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট ব্যবহার শুরু করেছে। অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে চলাচল করছে। এতে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সময় ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকির কারণে ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ নামে অতিরিক্ত বিমা খরচ আরোপ করা হয়েছে। এতে কন্টেইনারপ্রতি কয়েক হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেটররা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অপারেশনাল খরচও দ্রুত বাড়ে। কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নির্ধারিত রেট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই মাত্রা ছড়াতে পারে ভোগ্যপণ্যের বাজারেও খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান মিন্টু গণমাধ্যমকে বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। তবে এই সংঘাত যদি আরও কিছুদিন স্থায়ী হয় তবে সয়াবিন তেলের উপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এছাড়া বাকি অন্য কোনো পণ্যে তেমন একটা আশঙ্কা নেই। তবে যুদ্ধস্থগিত না হলে অন্যান্য পণ্যের ও দাম বাড়বে। এলসি জটিলতা এর মূল কারণ থাকবে।

রপ্তানিনির্ভর তৈরি পোশাক খাতও বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে চাপে পড়তে পারে। বিদেশি ক্রেতাদের ওপর এই বাড়তি খরচ চাপানো কঠিন হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খখ/মো মি

আগে“ইরানের বিরুদ্ধে আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি”-ডোনাল্ড ট্রাম্প
পরেঈদে ছুটি হচ্ছে ১৭-২৩ মার্চ সাত দিন