খাসখবর চট্টগ্রাম ডেস্ক: পিরোজপুরে বন্ধুকে খুন করে পালিয়ে আসা শেখ রুমান হোসেন চট্টগ্রাম নগরীতে আত্মগোপন করে। অবশেষে বন্ধুসহ পাহাড়তলী থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।
শনিবার (৭ অক্টোবর) রাতে পাহাড়তলী থানার হাজীক্যাম্প এলাকা থেকে শেখ রুমান হোসেন (৩০) এবং মাসুম বিল্লাহ (৩৩) কে গ্রেফতার করা হয়।
জানা গেছে, পুলিশের গাড়ি দেখে পালাতে দেখে ধরে ফেলে চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা পুলিশ টিম। সেখানে নিজেদের তারা মোবাইল চোর বলে পরিচয় দেয়। আটক করে থানায় আনলে বেরিয়ে পড়ে বোনের সাথে পরকীয়া করায় ‘বন্ধু’কে খুন করে উঠোনে পুঁতে ফেলার লোমহর্ষক তথ্য। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে এর আগে দুই নারীকে খুনের তথ্যও। এ যেন একেবারেই কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে পড়া সাপ। ঘটনাটি চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর হাজী ক্যাম্প এলাকার।
আটককৃতরা হলেন— শেখ রুমান হোসেন (৩০) এবং মাসুম বিল্লাহ (৩৩)। এরমধ্যে রুমান পিরোজপুরের নেছারাবাদ মকবুল মেম্বারের বাড়ির শেখ মকবুল হোসেনের ছেলে এবং মাসুম বিল্লাহ পিরোজপুরের নেছারাবাদের মৃধা বাড়ির মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে।
পুলিশ জানায়, পাহাড়তলী থানার একটি টিম বিশেষ অভিযানে বের হয়। অভিযান পরিচালনার সময় পাহাড়তলীর হাজী ক্যাম্প এলাকায় বসানো চেকপোস্ট দেখে দুই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে। বিষয়টি চেকপোস্টে থাকা পুলিশের নজরে পড়লে ওই দুজনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানায়, তাদের বাড়ি পিরোজপুর। পুলিশ তাদের কাছ থেকে চট্টগ্রামে আসার কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, মোবাইল ফোন চুরি করে চট্টগ্রাম শহরে এসে আত্মগোপন করেছে। তাদের কথাবার্তায় এবং আচার-আচরণে সন্দেহ হওয়ায় চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ থানাকে অবহিত করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের দুইজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিকল্পিতভাবে খুন করে লাশ লুকানোর এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে পড়ে আটক মাসুম বিল্লাহর জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য থেকে। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুম বিল্লাহ জানায়, সে ‘দোষী নয়’ এবং সে কোনো কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্তও নয় বরং তার সাথে থাকা শেখ রুমানই ‘আসল দোষী’। রুমান তার মো. হাসানুর রহমান অপু নামে এক বন্ধুকে খুন করে লাশ গুম করতে বাড়ির আঙিনায় গর্ত করে মাটিতে পুঁতে রাখে। পরে আত্মগোপনের জন্য তার (মাসুম বিল্লাহ) কাছে ঢাকা শহরে চলে যায়। সে (মাসুম বিল্লাহ) পেশায় গাড়ি চালক। তাই তাকে নিয়ে রুমান আত্মগোপন করার উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম চলে আসে। মাসুম বিল্লাহর জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসে পিরোজপুরের রুমানের হত্যাকাণ্ডের তথ্য।
রোববার (৮ অক্টোবর) সকালে পাহাড়তলী থানায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।
উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মাসুমের পর রুমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে খুনের কথা স্বীকার করে। সে জানায়, তার বোনের সঙ্গে অপু নামের একজনের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। তাই ওই অপুকে হত্যা করেছে রুমান। এছাড়াও অপুর সঙ্গে তাদের পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। তার বোন যখন জর্ডান থেকে আসে; তখন রিসিভ করার জন্য অপুও যায়। দীর্ঘদিন তাদের পরিবারে অপুর আসা-যাওয়া হয়। পরবর্তীতে রুমানকে তার মা এবং বোন জানায়, অপু ও তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সে কিছু টাকা নিয়েছিল সেগুলো দিচ্ছিল না। এছাড়াও বোনের সঙ্গে অপুর অনৈতিক সম্পর্কের কথাও জানতে পারে রুমান।’
তিনি আরও বলেন, ‘বোনের পরকীয়া প্রেমিক অপুকে খুন করার জন্য আগে থেকেই ওই পরিবার পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তাই গত ১ অক্টোবর ঘরের আঙ্গিনায় গর্ত করে রাখে আর দু’দিন পর অপুকে রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যার আগের দিন রাতেও অপু সেই ঘরে খাওয়া-দাওয়া করে। যেহেতু পারিবারিকভাবে তার যাতায়াত ছিল।’
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আরও জানান,
‘পরে পিরোজপুরে ফোন করে জানতে পারি, কয়েকদিন আগে বোনের সঙ্গে পরকীয়া করার অভিযোগ রুমান তার বন্ধুকে (অপু) খুন করে এবং আত্মগোপন করার উদ্দেশ্যে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। হত্যা করার দু’দিন আগে থেকে বাড়ির আঙিনায় কবরের মতো একটি গর্ত করে রুমান। পরে অপুকে হত্যা করে ওই গর্তের মধ্যে লুকিয়ে রাখে’।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুমান জানায়, তার বোনের সঙ্গে পরকীয়া করছিল অপু সেই কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার বোন ডিভোর্সি ছিল এবং জর্ডানে চাকরি করতো। জর্ডান থেকে বেশকিছু দিন আগে এসেছে। সেই ক্ষোভ (পরকীয়া) থেকে হত্যা করেছে বলে জানায় রুমান।’
উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আরও বলেন, ‘আসামি রুমান হোসেন একজন দুর্ধর্ষ খুনি। সে বিগত ১০/১২ বছর আগে তার পাশের গ্রামের দুই নারীকে খুন করে। সে ওই মামলার ১ নম্বর চার্জশিটভুক্ত আসামি। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে। আসামিদের পিরোজপুর জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
গত বুধবার (৪ অক্টোবর) মো. হাসানুর রহমান অপুকে বাড়িতে ডেকে নেন রুমান। সেই থেকে অপু নিখোঁজ ছিল। পরে গত ৭ অক্টোবর সকালে ওই গ্রামের জহির নামে এক ছেলে রুমানের বাড়ির পাশের বাগানে সুপারি পাড়তে গেলে দুর্গন্ধ পায়। পরে জহির বিষয়টি পার্শ্ববর্তী মাদরাসার সামনে থাকা লোকজনকে জানালে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি খুঁড়ে লাশ দেখতে পেয়ে চিৎকার দেয়। এ সময় চিৎকার শুনে এলাকার শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে এসে অপুর মরদেহ দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে রুমানের ঘর ঘেরাও করে এবং দুইটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। পরে স্থানীয়রা রুমানের মা লিপি বেগম, বোন সুমনা আকতার ও ভাতিজি সাদিয়া আক্তারকে আটক করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অপুর মরদেহ উদ্ধার করে ও আটকদের থানায় নিয়ে যায়।
ঘটনার পর থেকেই রুমান পলাতক ছিল। সে নিজেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আত্মগোপন করে। পরে ৭ অক্টোবর রাতে সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানাধীন হাজী ক্যাম্প এলাকায় বসানো চেকপোস্টে চোরাই মোবাইল সন্দেহে ধরা পরে রুমানসহ তার এক বন্ধু। এ সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে চাঞ্চল্যকর লোমহর্ষক খুন করে লাশ গুমের রহস্য উদঘাটিত হয়।
পাহাড়তলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জহির উদ্দিন জানান, রুম্মান পিরোজপুরে তার এক বন্ধুকে হত্যা করে প্রথমে ঢাকায় পালিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তার আরেক বন্ধু মাসুম বিল্লাহর কাছে আশ্রয় নিয়েছিল।
পেশায় কাভার্ড ভ্যানচালক মাসুম বন্ধু রুম্মানকে লুকিয়ে রাখার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন। শনিবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাহাড়তলীর হাজী ক্যাম্প এলাকায় পুলিশ দেখে পালানোর চেষ্টা করে রুম্মান ও মাসুম। তথন তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায় পিরোজপুরে মোবাইল চুরি করে তারা চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেছে। পরে তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও পিরোজপুর জেলা পুলিশের সঙ্গে কথা বলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানা যায়।
তিনি আরও জানান, নিহত অপু ও গ্রেফতার রুম্মান শেখ ব্যবসায়ীক বন্ধু ছিল। তারা যৌথভাবে সুপারি ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়ীক বন্ধুত্বের কারণে তাদের দুইজনের মধ্যেই বাড়িতে আসা যাওয়া ছিল। রুম্মানের বোনের সঙ্গে অপুর পরকীয়া সম্পর্ক এবং ব্যবসার জন্য আর্থিক লেনদেন ছিল। বিষয়টি তার পরিবারের সদস্যরা মানতে পারেনি। রুম্মানের পরিবারের সদস্যরা মিলে অপুকে খুন করা পরিকল্পনা করেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১ অক্টোবর বাড়ির পেছনে খড়ের গাঁধার মধ্যে গর্ত করে রেখেছিল। ৪ অক্টোবর পরিকল্পনা করে রুম্মান তার বাড়িতে অপুকে নিয়ে আসেন। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর মা, বোনসহ কয়েকজন মিলে গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয় অপুকে। পরে মরদেহটি ওই গর্তে মাটি চাপা দিয়ে রাখে।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার সমেদয়কাঠি ইউনিয়নের দক্ষিণ শেহাংগল গ্রামের রুম্মান শেখের বাড়ির পাশে খড়ের গাদা থেকে হাসানুর রহমান অপুর (৩৫) মরদেহ পাওয়া যায়। অপু গত ৪ অক্টোবর রুম্মানের সঙ্গে বের হয়ে আর বাড়ি ফিরেনি। পরে ৫ অক্টোবর তার স্ত্রী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
খখ/মো মি


