খাসখবর খেলা ডেস্ক: বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে যখন উৎসবের আমেজে মেতে উঠছে বিশ্ব, তখন অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোয় দেখা দিয়েছে এক ভিন্ন উদ্বেগ। আসন্ন টুর্নামেন্ট উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীর আগমনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে মানবপাচার, জোরপূর্বক যৌন শোষণ এবং সংগঠিত অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষক ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।
মেক্সিকোর জাতীয় দৈনিক মিলেনিও-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিভিন্ন অপরাধী চক্র ও মাদক কার্টেল তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিপুল দর্শনার্থীর উপস্থিতিকে তারা সম্ভাব্য আর্থিক লাভের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোয় মোট ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ম্যাচগুলো হবে মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মন্তেররেই শহরে। গবেষকদের মতে, এই তিন শহরের কিছু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যৌন বাণিজ্য, মানবপাচার ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব রয়েছে।
বিশেষ করে গুয়াদালাহারা শহরকে শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনগুলোর অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের দাবি, সেখানে অনেক পেশাজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর মতো যৌনকর্মীরাও অপরাধী চক্রের চাপ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
মন্তেররেই শহরেও বিভিন্ন অপরাধী নেটওয়ার্কের সক্রিয়তার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। শহরের কিছু বিনোদনকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক এলাকায় এসব গোষ্ঠীর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
রাজধানী মেক্সিকো সিটিতেও মানবপাচার ও সংগঠিত অপরাধ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সংবাদমাধ্যম অ্যানিমেল পলিটিকো জানিয়েছে, মানবপাচার ও জোরপূর্বক যৌন শোষণ বর্তমানে অনেক অপরাধী গোষ্ঠীর জন্য লাভজনক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি এই খাত থেকেও বিপুল অর্থ উপার্জন করছে সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলো।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন সৃষ্টি করে। ফলে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক কিংবা অন্যান্য বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে মানবপাচার চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার ঝুঁকি নতুন নয়।
রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে মানবপাচারের চিত্র আরো বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরের দক্ষিণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে ভেনিজুয়েলার কুখ্যাত গ্যাং ত্রেন দে আরাগুয়া এবং স্থানীয় ত্লাহুয়াক কার্টেল। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ও পূর্ব অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে সিজেএনজি ও সিনালোয়া কার্টেল। মেক্সিকোর আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যানিমেল পলিটিকো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ সামনে রেখে দেশটির ১০টি শীর্ষ অপরাধী চক্রের মধ্যে ৯টিই এখন জোরপূর্বক দেহ ব্যবসা বা পতিতাবৃত্তি থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি মানবপাচার এখন মেক্সিকান কার্টেলগুলোর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, এই কালোবাজারি ব্যবসার বৈশ্বিক মূল্য বছরে প্রায় ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ ১৭ হাজার ১৩ কোটি টাকার সমান। অ্যানিমেল পলিটিকো তাদের প্রতিবেদনে আরও দাবি করেছে যে, মাদক চক্রগুলো নারীদের শুধু যৌন কাজেই বাধ্য করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের জিম্মি করে মাদক পাচার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের ওপর নজরদারির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করাতেও বাধ্য করছে। বিশ্বকাপের ফুটবল রোমাঞ্চের আড়ালে মেক্সিকোর এই অন্ধকার চিত্র এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের জন্য আধুনিক স্টেডিয়াম বা কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। মানবপাচার প্রতিরোধ, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে মেক্সিকোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
খখ/মো মি


