খাসখবর জাতীয় ডেস্ক➤আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। লৈঙ্গিক সমতার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা, তাদের কাজের স্বীকৃতি দানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সাফল্য উদযাপনের উদ্দেশ্যে নানা আয়োজনে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় দিনটি।
এ বছরের নারী দিবসে জাতিসংঘের স্লোগান ‘নারীর সুস্বাস্থ্য ও জাগরণ’। নারীর প্রতি সবরকম বৈষম্য ও অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটিয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব গড়ার কাজে পুরুষের সমান অবদান রাখার প্রত্যয় নিয়ে নারীর এগিয়ে চলা আরও বেগবান হোক। “নারী-পুরুষের সমতা, টেকসই আগামীর মূল কথা” (Gender equality today for a sustainable tomorrow)—এই প্রতিপাদ্যে এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সারাদেশে শোভাযাত্রা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে দিবসটি উদযাপন করবে। দিবসটি উপলক্ষে আলাদা আলাদা বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নারী দিবস যেভাবে এলোঃ
সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অর্জন উদযাপনের পাশাপাশি সমাজে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এর সূচনা সেই ১৬২ বছর আগে। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ঠিক করা ও কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা।
পরে ১৯০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ১৭টি দেশের ১০০ জন নারী প্রতিনিধির অংশগ্রহণে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ওই সম্মেলনেই পরের বছর থেকে ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব আসে। সেই থেকেই ধীরে ধীরে ৮ মার্চ দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী অধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়। অনেক দেশই সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয় দিবসটিকে। অনেক দেশেই এই দিনটি নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে পালন করে থাকে।
রাষ্ট্রপতির বাণীঃ
আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২২ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। ‘টেকসই আগামীর জন্য, জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য’ দিবসের এই প্রতিপাদ্যটিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারীদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকার নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। রাষ্ট্রপতি দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সহযাত্রী হিসেবে এক সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তার আশা একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব গড়ার কাজে পুরুষের মতো সমান অবদান রাখার প্রত্যয় নিয়ে নারীর এগিয়ে চলা আগামীতে আরও বেগবান হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বাণীঃ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে পৃথক এক বাণীতে বিশ্বের সকল নারীর প্রতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, নারী তার মেধা ও শ্রম দিয়ে যুগে যুগে সভ্যতার সকল অগ্রগতি এবং উন্নয়নে সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে। সারাবিশ্বে তাই আজ বদলে গেছে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। এখন নারীর কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে স্বীকৃতি। তিনি বলেন, এদেশের নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যেমন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তেমনিভাবে ২০৪১ সালের মধ্যে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলাও সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আর কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নামেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকরা। সেই মিছিলে হামলা করে সরকারি বাহিনী। পরে ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন। ক্লারা জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা আন্দোলন আর সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯১১ সাল থেকে একটি দিন নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। পরে ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে।
অর্থাৎ গত শতাব্দীর শুরুতে নারী জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে নারী দিবসের ধারনার উত্থান। বছর পরম্পরায় নারীদের অধিকার চাওয়ার এই দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায় এবং জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। আজ বিশ্বের সকল নারী সংগঠন ও সকল রাষ্ট্র ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন করে। আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বারকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, চীন, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাকিস্তান, কিরঘিস্তান, লাউস, মাদাগাস্কার, মলডোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনেগ্রো, নেপাল, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া ৮ মার্চ নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে পালন করে। প্রথাগতভাবে পুরুষরা তাদের মা, স্ত্রী, নারীবন্ধু, নারী সহকর্মীদের এই দিনে ফুল ও উপহার দিয়ে সম্মানিত করে। কোনও কোনও দেশে এই দিনটি মা দিবসের মতো একই সম্মানে উদযাপন করা হয়।
গত কয়েক দশকে নারী দিবস উদযাপনের ধরণে পরিবর্তন এসেছে। কেবল উন্নয়ন সংস্থা না, বিভিন্ন স্তরে দিনটিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে শ্লোগান নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত বড় বড় প্রতিষ্ঠান দিবসটিকে নারীদের জন্য স্মরণীয় করে তুলতে নানারকম প্রচেষ্টার মধ্যে থাকে।
এবছর বাংলাদেশের নানারকম আয়োজন শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ আগে থেকেই। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৬ মার্চ রমনা পার্কের অরুণোদয় গেইট থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েকশ’ নারী একটি পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘পৃথিবী আমারে চায়: জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমরা’।
নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী রোকেয়া কবীর মনে করেন দিবসকেন্দ্রিক এই উদযাপন আরও সুনির্দিষ্ট করে পালনের দরকার আছে। এটি কেবল উদযাপন তাও নয়। এর রাজনীতি আছে। নারী পুরুষের সমতার প্রশ্নে কোন আপসের জায়গা নেই। তবে নারীর অগ্রগতিতে পুরুষকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন আছে। যতদিন না সেই সমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ততদিন নারীর অধিকারের প্রশ্নগুলোকে সামনে আনার জন্য যতরকমের বিশেষ ব্যবস্থা করা যায় সেটি করতে হবে।
নারী দিবসের কর্মসূচিঃ
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২২ উদযাপন উপলক্ষে আলোচনা সভা আয়োজন করেছে মঙ্গলবার সকাল ১১টায়। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এ সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক ফরিদা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন ইউএন উইমেন-এর অফিস প্রধান গীতাঞ্জলি সিং।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনও নানা কর্মসূচি নিয়েছে। জাতীয় প্রেস ক্লাব আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে নারী সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
এদিকে, ৬৬টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি নারী দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ বছর সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে— ‘নারী-পুরুষের সমতা, টেকসই আগামীর মূল কথা’। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সভাপতিত্বে এ আয়োজনে সারাদেশের নারী অধিকার সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
এদিকে, নারী দিবসে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় র্যালির আয়োজন করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। র্যালির পরে ডিআরইউ নসরুল হামিদ মিলনায়তনে নারী দিবসের বিশেষ সংকলন ‘কণ্ঠস্বর’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হবে।
খখ/মো মি


