খাসখবর প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ডেস্ক: সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বরং সময়ের দাবি। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব গণমাধ্যমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাংবাদিকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি, তথ্য যাচাই এবং পাঠক-দর্শকের কাছে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া, সাংবাদিকতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কখনোই সাংবাদিকতার সত্যনিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার বিকল্প হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের (সিআরএফ) সভাপতি কাজী আবুল মনসুর।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চট্টগ্রামের আইটি প্রতিষ্ঠান ‘আইটি ক্যারিয়ার সল্যুশন’-এর সহযোগিতায় ফোরামের সদস্যদের জন্য আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘এআই টুলস’ প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
কাজী আবুল মনসুর বলেন, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, ফ্যাক্ট-চেকিং, সংবাদ উপস্থাপন এবং পাঠকের আগ্রহ ও প্রয়োজন বুঝতে বিভিন্ন গণমাধ্যম এআই প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে।
ফলে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করা এবং সংবাদ তৈরির বিভিন্ন ধাপ আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথিপত্র, সরকারি প্রতিবেদন, আদালতের দলিল কিংবা বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অজানা যোগসূত্র খুঁজে বের করতে এআই সাংবাদিকদের সহায়ক হতে পারে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় এসব প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারের অডিও থেকে লিখিত প্রতিলিপি তৈরি, দীর্ঘ প্রতিবেদন সংক্ষেপ করা, তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ, অনুবাদ এবং সংবাদ উপস্থাপনার বিভিন্ন কাজে এআই সময় ও শ্রম সাশ্রয় করতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও বিভিন্নভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার ও এর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদমাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সংবাদ সংগ্রহ, উপস্থাপন ও পাঠকসেবার নতুন পদ্ধতি বিকাশে ভূমিকা রাখছে। খেলাধুলার স্কোর, শেয়ারবাজারের হালনাগাদ তথ্য এবং আবহাওয়ার মতো নিয়মিত ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন তৈরিতেও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে।
সিআরএফ সভাপতি বলেন, এআইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বিপুল তথ্যের মধ্য থেকে সংবাদমূল্যসম্পন্ন বিষয় খুঁজে বের করার সক্ষমতা। কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি, পরিসংখ্যান ও বক্তব্য পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে এবং অনুসন্ধানের সম্ভাব্য দিক নির্ধারণ করতে পারেন। তবে এআই কোনো তথ্য সামনে আনলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। মূল নথি, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর, বিকৃত ছবি, ডিপফেক ভিডিও এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। এসব শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক যাচাইপ্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ছবি বা ভিডিওর উৎস অনুসন্ধান, ঘটনার সময় ও স্থান যাচাই এবং বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের মধ্যে অসংগতি খুঁজে দেখার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো এআই টুলের ফলাফলকেই এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
কাজী আবুল মনসুর বলেন, ‘বিশ্বের সাংবাদিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে সাংবাদিকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে হবে। এআই টুলসের যথাযথ ব্যবহার সাংবাদিকতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে এর কার্যকর ব্যবহার শিখতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সংবাদ প্রকাশের চূড়ান্ত দায়িত্ব সাংবাদিকের। এআই তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সত্য যাচাই, জনস্বার্থ বিবেচনা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব সাংবাদিকেরই।’
তিনি বলেন, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, তথ্যের নিরাপত্তা এবং পক্ষপাতের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। যাচাই না করা তথ্য, সংবেদনশীল নথি কিংবা সূত্রের পরিচয় প্রকাশ করে এমন উপাদান অসতর্কভাবে এআই প্ল্যাটফর্মে দেওয়া উচিত নয়। এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি বা অডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
তিনি ফোরামের সদস্যদের এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন এবং সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরাম ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ, আইটি ক্যারিয়ার সল্যুশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নজরুল ইসলাম, ফোরামের নির্বাহী কমিটির সদস্য কামরুল হুদা, সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আবুল কাশেম সরোজ এবং দপ্তর সম্পাদক হাসান মুরাদ।
তিন দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের ২৫ জন সদস্য অংশ নিচ্ছেন। কর্মশালায় এআই টুলসের ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি আয়োজনে আইটি ক্যারিয়ার সল্যুশনের পক্ষে সার্বিক সহযোগিতা করছেন হেফাজুল ইসলাম, শাখাওয়াত হোসেন, মোহাম্মদ শাহরিয়ার, রাফায়েত ইসলাম রাফি ও তারেফুল ইসলাম রাফি।
খখ/মো মি


